image

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নতুন সরকারের যত চ্যালেঞ্জ

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

শেষ হলো বহুল প্রত্যাশিত ভোট। দু-একদিনের মধ্যেই রাষ্ট্রের হাল ধরবে নতুন একটি সরকার। সেই সরকার একটি স্বস্তিদায়ক অর্থনীতি পাচ্ছে না। পাচ্ছে কঠিন চ্যালেঞ্জিং, অস্বস্তিদায়ক ও বন্ধুর পথে এগোনোর অর্থনীতি। ভঙ্গুর এই অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নতুন সরকারকে অজনপ্রিয় অনেক সিদ্ধান্তই হয়তো নিতে হবে। এসব সিদ্ধান্তের বেশির ভাগই আসবে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) চাপ থেকে।

এদিকে আইএমএফের চাপ এড়িয়ে যাওয়াও নতুন সরকারের জন্য বেশ কঠিন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক তাদের পৃথক প্রতিবেদনে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিষয়ে মন্তব্য করেছে। এসব মোকাবিলার কৌশল সম্পর্কেও পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু সরকারের জন্য এগুলো বাস্তবায়ন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।

আইএএফের সঙ্গে চলমান ৫৫০ কোটি (৫.৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত থাকবে কি না, সে সিদ্ধান্ত হবে নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর। তাদের কথামতো সরকার সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলে তবেই এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো ছাড় করবে আইএমএফ।

৪৭০ কোটি (৪.৭ বিলিয়ন) ডলারের ঋণ কর্মসূচির পর গত বছরের জুনে এর সঙ্গে ৮০ কোটি যোগ করে তা ৫৫০ কোটি (৫.৫ বিলিয়ন) ডলারে উন্নীত করা হয়। এ কর্মসূচির অধীনে আইএমএফ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে পাঁচ কিস্তিতে দিয়েছে ৩৬৪ কোটি (৩.৬৪ বিলিয়ন) ডলার। সে অনুযায়ী এখনো বাকি আছে ১৮৬ কোটি (১.৮৬ বিলিয়ন) ডলার।

এই ঋণর ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা ছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। কিন্তু সেই অর্থ ছাড় করেনি আইএমএফ। নতুন সরকারের সঙ্গে এই ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ হলে তবেই বাকি কিস্তিগুলো দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। সেক্ষেত্রে দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই নতুন সরকারকে আইএমএফের কথামতো চলতে হবে। আর সেজন্য তাদের অনেক শর্ত মানতে হবে।

বদলে যাওয়া বাংলাদেশে বিপুল প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে তরী বাইতে গিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবেলা করতে হবে নতুন সরকারকে, তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা।

ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামল শেষে দেশ যখন গণতান্ত্রিক উত্তরণের চূড়ান্ত সোপানে, তখন পরবর্তী সরকার অর্থনীতির বন্ধুর পথ কেমন করে পাড়ি দেবে, সেই আলোচনা ঘুরেফিরে আসছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের প্রলেপ দেওয়ার আওয়াজ তুললেও সেখানে সফলতার পাল্লা ভারি হওয়ার বদলে ব্যর্থতাই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে সকল খাতে।

মূল্যস্ফীতি

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে বাড়তে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।

অধ্যাপক ইউনূসের সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আনার জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে, নতুন করে টাকা না ছাপানো এবং ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৭ শতাংশ।

সরকারের নানান প্রচেষ্টায় গত দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেও এসেছে। গত জানুয়ারিতে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

দারিদ্র্যের হার

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল, সেটি এখন বেড়ে ২১ শতাংশের ওপর চলে গেছে। আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে এখন ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়ে দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

রেমিটেন্সে উল্লম্ফন অব্যাহত

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে। নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতেও জোয়ার বয়ে গেছে এই সূচকে। গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরের পর এই মাসেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি দেশে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশে এই প্রথম পর পর দুই মাস ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসলো দেশে। এর আগেও এক মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারি প্রথম নয় দিনে (১ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি) ১১৩ কোটি ৫০ লাখ (১.১৩ বিলিয়ন) ডলার দেশে এসেছে। এই অঙ্ক গত বছরের ফেব্রুয়ারির একই সময়ের চেয়ে ৩২ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির এই নয় দিনে ৮৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার এসেছিল দেশে। আর পুরো মাসে এসেছিল ২৫২ কোটি ২৭ লাখ (২.৫২ বিলিয়ন) ডলার।

সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাত মাস নয় দিনে ২ হাজার ৫৬ কোটি ৫০ লাখ (২০.৫৬ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ৬৮১ কোটি ৮০ লাখ (১৬.৮২ বিলিয়ন) ডলার। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের সাত মাস নয় দিনে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি) গত অর্থবছরের একই সময়ের (২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি) চেয়ে ২২ দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি রেমিটেন্স এসেছে দেশে।

টানা ৬ মাস ধরে কমছে রপ্তানি আয়

রিজার্ভের প্রধান উৎস রপ্তানি আয় কমছেই। টানা ছয় মাস ধরে কমছে; গত বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের পর নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতেও কমেছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক। ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় রপ্তানি বাণিজ্যে এই বেহাল দশা। রপ্তানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে অস্থিরতার কারণেই রপ্তানি আয় কমছে। আগামী মাসগুলোতেও এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। এতে অর্থনীতিতে সংকট বাড়বে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন তারা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সপ্তম এবং নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৪১ কোটি ৩৬ লাখ (৪.৪১ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। যা গত অর্থবছরের সপ্তম মাস জানুয়ারির চেয়ে দশমিক ৫০ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারিতে আয়ের অঙ্ক ছিল ৪৪৩ কোটি ৬০ লাখ (৪.৪৪ বিলিয়ন) ডলার।

সামগ্রিক হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) পণ্য রপ্তানি থেকে আয় কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। এই সাত মাসে (গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি) ২ হাজার ৮৪১ কোটি ৫ লাখ ডলারের (২৮.৪১ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরের এই সাত মাসে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ২ হাজার ৮৯৬ কোটি ৯৫ লাখ (২৮.৯৭ বিলিয়ন) ডলার।

রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক থেকে আয় কমার কারণেই রপ্তানি বাণিজ্যে এই বেহাল দশা হয়েছে। অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর—এই তিন মাসকে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশে পোশাক রপ্তানির ভরা মৌসুম (পিক আওয়ার) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই তিন মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে বেশি আয় হয়ে থাকে। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ট্রাম্প শুল্পের ধাক্কায় ওলোটপালট বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতিতে এই হাল হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা।

রপ্তানি আয়ে বড় উল্লম্ফন নিয়ে শুরু হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর; এই আর্থিক বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৭৭ কোটি (৪.৭৭ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়, যা ছিল গত অর্থ বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের চেয়ে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। কিন্তু দ্বিতীয় মাস আগস্টে এসেই হোঁচট খায়। ওই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ (৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছিল। গত বছরের আগস্ট মাসের চেয়ে কমেছিল ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে আয় হয় ৩৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৩.৬২ বিলিয়ন) ডলার; কমেছিল ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। চতুর্থ মাস অক্টোবরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয় ৩৮২ কোটি ৩৮ লাখ (৩.৮২ বিলিয়ন) ডলার। যা ছিল গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।

পঞ্চম মাস নভেম্বরে ৩৮৯ কোটি ১৫ লাখ (৩.৮৯ বিলিয়ন) ডলার আয় করে বাংলাদেশ। যা ছিল গত অর্থবছরের পঞ্চম মাস নভেম্বরের চেয়ে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম। ডিসেম্বরে কমেছিল সবচেয়ে বেশি, ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কম। ওই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৯৬ কোটি ৮৩ লাখ (৩.৯৭ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বরে আয়ের অঙ্ক ছিল ৪৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৪.৬৩ বিলিয়ন) ডলার।

রিজার্ভ নিয়ে আর উদ্বেগ নেই

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ছিল ২০২১ সালের অগাস্টে, ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কোভিড মহামারি পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে রিজার্ভ কমতে শুরু করে। সেই সঙ্গে নানান উপায়ে অর্থ পাচারকেও বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ হ্রাসের কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের যখন পতন ঘটে, তখন বাংলাদেশের রিজার্ভ কমে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।

গত দেড় বছরে সেটি আবার ধাপে ধাপে বেড়ে এখন সন্তোষজনক অবস্থায় এসেছে। ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনায় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফনে রিজার্ভও বাড়ছে। রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স। গত ছয় মাস ধরে রপ্তানি আয় টানা কমলেও রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি রিজার্ভ বেড়ে বিপিএম-৬ হিসাবে ২৯ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। আর গ্রস বা মোট হিসাবে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।

৮ জানুয়ারি এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) নভেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের ১৫৩ কোটি (১.৫৩ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। গ্রস হিসাবে নামে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ফের ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। গত ২২ জানুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৮ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩২ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার।

গত ২৯ জানুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৮ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে। গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ২৯ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। গ্রস হিসাবে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে।

৫ মাসের আমদানি

ব্যয় মিটবে

বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে। সবশেষ গত নভেম্বর মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। সে হিসাবে বর্তমানের ২৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়। আগামী মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে আকুর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হবে। তার আগে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

আকু হলো এশিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যকার একটি আন্তঃআঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে এশিয়ার নয়টি দেশের মধ্যে যেসব আমদানি-রপ্তানি হয়, তার মূল্য প্রতি দুই মাস পরপর নিষ্পত্তি করা হয়।

আকুর সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ। এর মধ্যে ভারত পরিশোধ করা অর্থের তুলনায় অন্য দেশগুলো থেকে বেশি পরিমাণে ডলার আয় করে। অন্যদিকে বেশিরভাগ দেশকেই আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় হিসাবে অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হয়।

ব্যাংকখাতের দুরাবস্থা

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংকখাত ব্যাপক লুটপাটের শিকার হয়ে নাজুক হয়ে পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তারল্য সংকটে অনেক ব্যাংক গ্রাহকের টাকা পর্যন্ত দিতে পারছিল না। এমন পরিস্থিতর মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংকখাতে বেশকিছু সংস্কার উদ্যোগ নেয় অধ্যাপক ইউনূসের সরকার। লুটপাটের অভিযোগ ছিল যেসব ব্যাংকে, সেগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়। সেইসঙ্গে, দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক গঠন করেছে সরকার। এর বাইরে, আইনসহ নানান সংস্কার ও পরিবর্তনের উদ্যোগের ফলে গত দেড় বছরে ব্যাংকখাত কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

তবে এই সময়ে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সাল নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেওয়া এই বিপুল পরিমাণ ঋণ কীভাবে আদায় হবে, সেটা এখন একটা বড় প্রশ্ন। কারণ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীদের যারা ঋণ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায় করা যাচ্ছে না।

বিনিয়োগে বেহাল দশা

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করেছে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার। ব্যাংক ঋণকে নিরুৎসাহিত করতে বাড়ানো হয় সুদের হার। আর যখন ব্যাংক ঋণের সুদহার উচ্চ রাখা হয়, সেটার অর্থ দাঁড়ায় সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিনিয়োগ চাচ্ছেন না। সরকারের এমন নীতির কারণে গত দেড় বছরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগও আসেনি। এমনকি, বিনিয়োগ সম্মেলন করেও সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়াগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারেনি, যার ফলে অর্থনীতিতে গতি আসেনি। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতিই এর জন্য বড় অংশে দায়ী। অন্তবর্তী সরকার দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। আর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় বেসরকারিখাতে সেভাবে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি।

কমতে কমতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি একেবারে তলানিতে নেমে এসেছে। গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ আগের বছরের একই মাসের চেয়ে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি ২২ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ।

পাচারের অর্থ ফেরত

কতদূর?

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের সময় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে কত টাকা পাচার করা হয়েছে এবং এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে ২০২৪ সালের ২৮অগাস্ট একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। তিন মাসের মাথায় ওই কমিটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেখানে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করে দেশে ফেরাতে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকোভারি’ নামে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার। গত দেড় বছরে দেশে ৫৫ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করেছে সরকার।

এছাড়া বিদেশে ১০ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিসহ মোট ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা একটি জটিল প্রক্রিয়া বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কোন কোন দেশে, কারা অর্থ পাচার করেছে, সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। “তবে সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বলা কঠিন। বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের মতো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।” পরবর্তী সরকার এ বিষয়ে মনোযোগ দিলে তথ্যগুলো কাজে লাগাতে পারবে বলে জানান তিনি।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

» ভোটের আগে প্রতিদিন ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার প্রবাসী আয়

সম্প্রতি