image

টানা দরপতনেও বাজার মূলধন বাড়লো হাজার কোটি টাকা

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত সপ্তাহে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার কার্যদিবসেই দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। এরপরও সপ্তাহের ব্যবধানে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন ১ হাজার কোটি টাকার ওপরে বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে প্রধান মূল্যসূচক। পাশাপাশি দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে।

বাজার মূলধন বাড়ার পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচকও বেড়েছে। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স সপ্তাহজুড়ে বেড়েছে ৬৫ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ২২ শতাংশ। অন্য দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক গত সপ্তাহজুড়ে বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেয়ারবাজারে প্রথম লেনদেন হয় গত রোববার। নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পর প্রথম কার্যদিবসে শেয়ারবাজারে বড় উত্থান হয়। সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার কারণে ডিএসইর প্রধান সূচক একদিনে ২০০ পয়েন্ট বাড়ে। তবে এর পরের চার কার্যদিবসে শেয়ারবাজারে টানা দরপতন হয়। শেষ চার কার্যদিবস টানা দরপতন হলেও, প্রথম কার্যদিবসের বড় উত্থানের কারণে সপ্তাহ শেষে মূল্যসূচক বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বাজার মূলধন। এমনকি সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বাড়ার তালিকাও বড় হয়েছে।

গত সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২০৩টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৫৩টির দাম কমেছে এবং ৩৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ, দাম বাড়ার তালিকায় স্থান হয়েছে ৫২ দশমিক ১৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের।

দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ায় সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১০ হাজার ৩৭ কোটি টাকা যা আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৭ লাখ ৮ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন বেড়েছে ১ হাজার ৬০ কোটি টাকা বা দশমিক ১৫ শতাংশ।

বাজার মূলধন বাড়ার পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচকও বেড়েছে। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স সপ্তাহজুড়ে বেড়েছে ৬৫ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ২২ শতাংশ। অন্য দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক গত সপ্তাহজুড়ে বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। তবে ইসলামি শরিয়াহ ভিত্তিতে পরিচালিত কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক গত সপ্তাহজুড়ে কমেছে ১ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট বা দশমিক ১৭ শতাংশ।

এদিকে, গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের গতিও বেড়েছে। সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসে ডিএসইতে গড়ে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৫০ কোটি ৪ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় ৬৩৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি কার্যদিবসে গড় লেনদেন বেড়েছে ৪১১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বা ৬৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।

সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ার। কোম্পানিটির শেয়ার প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ৪১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিটি ব্যাংকের শেয়ার প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ৩৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রতিদিন গড়ে ২৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা ব্যাংক।

এছাড়া, লেনদেনের শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- ব্র্যাক ব্যাংক, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, রবি, মুন্নু ফেব্রিক্স, ওরিয়ন ইনফিউশন, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন এবং কে অ্যান্ড কিউ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম সপ্তাহে দেশের শেয়ারবাজারে দাম বাড়ার ক্ষেত্রে দাপট দেখিয়েছে পঁচা শেয়ার বা ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানি। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সপ্তাহজুড়ে দাম বাড়ার শীর্ষ ১০টি স্থানের মধ্যে ৯টিই দখল করেছে ‘জেড’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। দাম বাড়ার শীর্ষ দশে ভালো বা ‘এ’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান একটিও নেই। তবে মাঝারি মানের বা ‘বি’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আছে একটি।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে ‘এ’, ‘বি’, ‘এন’ এবং ‘জেড’ গ্রুপে বিভক্ত করা হয়। ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয় ‘এ’ গ্রুপে। ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানি থাকে ‘বি’ গ্রুপে, এ ধরনের কোম্পানিগুলো মাঝারি মানের হিসেবে বিবেচনা করা হয়। লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানিটির ঠিকানা হয় ‘জেড’ গ্রুপে, এ ধরনের কোম্পানিগুলোকে পচা কোম্পানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর নতুন তালিকাভুক্তি কোম্পানি থাকে ‘এন’ গ্রুপে।

গত সপ্তাহজুড়ে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চাহিদার শীর্ষে ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড। লোকসানে নিমজ্জিত হওয়ায় ২০১৯ সালের পর কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এই কোম্পানির শেয়ার দাম গত সপ্তাহে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার কার্যদিবস বেড়েছে। এতে এক সপ্তাহেই শেয়ার দাম বেড়েছে ২৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। টাকার অঙ্কে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ১ টাকা ২০ পয়সা।

গত সপ্তাহের লেনদেনের শুরুতে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিলো ৪ টাকা ১০ পয়সা, যা সপ্তাহ শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ৩০ পয়সা। কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ৩২১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭০টি। এতে এক সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ার দাম বেড়েছে ৩৮৬ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ টাকা।

দাম বাড়ার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি। এক সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ার দাম বেড়েছে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। টাকার অঙ্কে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৮০ পয়সা। লোকসানে পতিত হওয়ায় ২০১৩ সালের পর এই কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ দেয়নি। স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানিটির স্থান হয়েছে পচা জেড গ্রুপে।

পরের স্থানা রয়েছে জেড গ্রুপের আর এক প্রতিষ্ঠান এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিল। ২০২৩ সালের পর কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ দিতে পারেনি। গত সপ্তাহে এই কোম্পানির শেয়ার দাম বেড়েছে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। টাকার অঙ্কে প্রতিটি শেয়ার দাম বেড়েছে ৩ টাকা ৩০ পয়সা।

এর পরের তিনটি স্থানও রয়েছে ‘জেড’ গ্রুপের দখলে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের পর বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ দিতে না পারা ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের শেয়ার দাম বেড়েছে ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০১৭ সালের পর থেকে লভ্যাংশ দিতে না পারা প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের শেয়ার দাম বেড়েছে ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ।

দাম বাড়ার তালিকায় পরের স্থানটিতে থাকা প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের শেয়ার দাম বেড়েছে ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এই কোম্পানিটি ২০১৯ সালের পর বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।

দাম বাড়ার শীর্ষ তালিকায় স্থান পাওয়া জেড গ্রুপের বাহিরের একমাত্র কোম্পানি ড্যাফোডিল কম্পিউটার। এই কোম্পানিটির শেয়ার দাম বেড়েছে ২২ শতাংশ। এতে দাম বাড়ার শীর্ষ তালিকায় সাত নম্বরে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানিটি সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। তার আগে ২০২৩ ও ২০২২ সালেও ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

দাম বাড়ার শীর্ষ দশে স্থান পাওয়া বাকি তিন কোম্পানির মধ্যে ফ্যামেলিটেক্স’র শেয়ার দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালের পর কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। ২০১৬ সালের পর লভ্যাংশ দিতে না পারা তুং হাই নিটিংয়ের শেয়ার দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ। সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। এই কোম্পানিটি ২০১৯ সালের পর বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি