ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক
আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ
যুক্তরাষ্ট্রের আইইইপিএ এর ১২২ ধারা অনুযায়ি প্রেসিডেন্ট ঢালাও শুল্কারোপ করতে পারে না
বিশেষ কিছু পণ্যে ট্রাম্প আলাদা আলাদা শুল্কারোপ করতে পারবে
পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন
নতুন আমদানি শুল্ক নীতির মাধ্যমে আবারও বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। আইনি জটিলতায় আগের আগের শুল্ক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সব দেশের ওপর অভিন্ন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, যদি ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক কাঠামো বাতিল হয় তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে করা চুক্তির কি হবে?
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে রিসিপরক্যাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, অনেক দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক নেয়, অথচ তাদের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলক কম বাধায় প্রবেশ করে। এই যুক্তি সামনে এনে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক বসায়। বাংলাদেশও সেই তালিকায় ছিল। এতে তৈরি পোশাকসহ বেশ কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অতিরিক্ত শুল্কের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় দেশের রপ্তানি খাতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
তখন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতা বাড়ানো হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করে। ওয়াশিংটনে লবিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়, মার্কিন ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে বাংলাদেশ মূলত শ্রমনির্ভর উৎপাদন অর্থনীতি যা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই আলোচনার ফল হিসেবে বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তি পায়। সম্ভাব্য উচ্চ শুল্কের পরিবর্তে তুলনামূলক কম হারে শুল্ক নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট পণ্যে নমনীয়তার ইঙ্গিত আসে। তবে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। কারণ রিসিপরক্যাল ট্যারিফ মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তভিত্তিক হওয়ায় যে কোনো সময় পরিবর্তনের ঝুঁকি ছিল।
পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন আসে ২০ ফেব্রুয়ারি। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত আগের ট্যারিফ ব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং বাতিল করে দেয়। এর পরপরই নতুন করে অভিন্ন ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। প্রথম দৃষ্টিতে এটি বাড়তি চাপ মনে হলেও বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন।
গতকাল এই বিষয়ে কথা হয় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়ের পর ট্রাম্পের চুক্তির আর কোনো কার্যকারিতা থাকবে না। অর্থাৎ কোনো দেশই সেই চুক্তি মানতে বাধ্য নয়। আর এমনিতেও এই চুক্তি এখনও কার্যকার হয়নি। কার্যকর হওয়ার কথা ছিল আরও ৬০দিন পর। তারপরও আগের সরকার কেন যে তাড়াহুড়া করে এই চুক্তি করলো বুঝতে পারছি না।’
তবে বাংলাদেশকে এখনও যোগাযোগ রাখতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বলছে, ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ) এর ১২২ ধারায় প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। অর্থাৎ দেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি যে তিনি তার ইচ্ছামতো সারা বিশ্বে শুল্কারোপ করতে পারেন। তবে আমাদের যোগাযোগ রাখতে হবে এই কারণে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অন্যান্য আরও কয়েকটি আইন অনুযায়ি বিশেষ কিছু পণ্যে শুল্কারোপ করতে পারে। তাই সেসব পণ্যে যেন বেশি শুল্ক না বসে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে বাংলাদেশের।’
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তুলনামূলক বেশি শুল্ক দিয়ে পণ্য রপ্তানি করে আসছিল। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে কেউ কেউ বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করলেও বাংলাদেশ সেই সুবিধা পায়নি। ফলে সব দেশের জন্য একই হারে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র কিছুটা সমান হয়ে যেতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সংবাদকে বলেন, ‘নতুন ১০ শতাংশ ট্যারিফ সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ায় আমাদের আগের লাভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃস্থাপন হয়নি। এ পরিস্থিতিতে চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ কী দিচ্ছে এবং কী পাচ্ছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন ও সমন্বয় করা জরুরি, যাতে যাতে আমরা সুবিধা নিতে পারি।’
তবে এই সুবিধা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ক্রেতারা শুধু শুল্ক নয়, উৎপাদন খরচ, সরবরাহের গতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শ্রমমানকেও গুরুত্ব দেয়। যদি নতুন শুল্কের ফলে বিশ্বব্যাপী পোশাকের দাম বেড়ে যায়, তাহলে ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিতে পারে। তখন বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ এর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সংবাদকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২ ব্যবহার করে অধিকাংশ আমদানিপণ্যের ওপর অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এটি স্থায়ী ব্যবস্থা নয় বরং একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এই অতিরিক্ত শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে কার্যকর হবে এবং সর্বোচ্চ ১৫০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। এই সময়সীমাই এখন বাণিজ্য আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের বিষয় হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশের উচিত হবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।’
তবে এই অবস্থায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল না হয়ে বিকল্প বাজার অনুসন্ধান, ইউরোপ ও এশিয়ার নতুন বাজারে প্রবেশ, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন এবং শিল্পে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, নতুন ১০ শতাংশ শুল্ককে সরাসরি লাভ বা ক্ষতি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। আগের মতো হঠাৎ দেশভিত্তিক কঠোর শুল্কের ঝুঁকি কমেছে। এটা ইতিবাচক দিক। তবে বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এটা মূলত দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এর আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে বাংলাদেশ। তখন সরকার দাবি করেছিল, শুল্ক চুক্তিতে বাংলাদেশ দুটি বড় অর্জন পেয়েছে। একটি হলো, নতুন শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো। আরেকটি, যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালে তৈরি পণ্য রপ্তানিতে বাড়তি শুল্ক এক টাকাও দিতে হবে না।
নতুন শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ। বিবৃতিতে দুই দেশ বলেছে, এই চুক্তির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও কাঠামোগত রূপ দেওয়া হবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিদ্যমান বাধাগুলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হবে। এতে উভয় দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারে প্রবেশ সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ট্রাম্পের রিসিপরক্যাল ট্যারিফের আওয়ায় চুক্তি অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেওয়ার পর আর সেটি কার্যকর থাকছে না।
আন্তর্জাতিক: মার্কিন নীতির ‘নাটকীয়তায়’ বিশ্ব বাণিজ্যে ঝড়