মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার আগুন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ভূখণ্ডে বিস্ফোরণের খবরে রোববার (১ মার্চ) সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক এই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। লেনদেনের শুরুতেই বিক্রির চাপ বাড়ায় ডিএসইর প্রধান সূচক ২০৮ পয়েন্ট পর্যন্ত ধসে যায় ।
পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও ক্রেতাদের চেয়ে বিক্রেতাদের আধিক্য থাকায় বড় পতন নিয়েই দিন পার করছে বাজার। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ডিএসইতে মাত্র ১৯টি প্রতিষ্ঠানের দাম বেড়েছে, বিপরীতে দাম কমেছে ৩৫১টির। এতে প্রধান সূচক ১৪৩ পয়েন্ট নিচে অবস্থান করছে। অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৫৪ পয়েন্ট কমেছে। লেনদেন অংশ নেওয়া ৫৫ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ৮টির, কমেছে ৪৩টির ।
সকালে লেনদেন শুরুর পরপরই অধিকাংশ খাতের শেয়ারের দাম কমতে শুরু করে। ইরানে হামলার খবরে আতঙ্কিত হয়ে এক শ্রেণির বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি করেন। এতে অল্প সময়ের মধ্যে ডিএসইর প্রধান সূচক ২০৮ পয়েন্ট কমে যায়। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশীয় পুঁজিবাজারেও।
এমন পতনের পর বাজারে কিছু ক্রেতাকে সক্রিয় দেখা যায়। ফলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতনের মাত্রা কিছুটা কমে আসে। ১০ মিনিটের মধ্যেই ডিএসইর প্রধান সূচক প্রায় ১০০ পয়েন্ট উদ্ধার করে । তবে সার্বিকভাবে ক্রেতার থেকে বিক্রেতার আধিক্য থাকায় বড় পতনের মধ্যেই দিন পার করছে বাজার। ডিএসইতে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে ২৫৩ কোটি ৯ লাখ টাকা । অপর শেয়ারবাজার সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে আসেন। ফলে শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়। ইরানে হামলার পর তেলবাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। এই আতঙ্ক শেয়ারবাজার খুলতেই বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি করেন।
বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। এসব আশঙ্কা পুঁজিবাজারে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে । ডেইলি সানের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির দেশে জ্বালানি ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি চাপ সৃষ্টি করবে। তৈরি পোশাক রপ্তানি কমতে পারে বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস পেলে। আর মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্সও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, এসব আশঙ্কা থাকলেও যে কোনো সময় বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের শেয়ারবাজারে নেতিবাচক ধারা বিরাজ করছে। ফলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম এখন অবমূল্যায়িত অবস্থায় আছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বিক্রির চাপ না বাড়ালে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে ।
একটি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তা পরামর্শ দেন, এখন আতঙ্কে বিক্রি না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা উচিত। কারণ, অনেক সময় এমন তাৎক্ষণিক পতন পরবর্তীতে আংশিকভাবে কাটিয়েও ওঠে । তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। নতুবা আন্তর্জাতিক এই সংকটের ধাক্কা সামলাতে পারবে না দেশের পুঁজিবাজার।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জ্বালানি সংকট থেকে শুরু করে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স হ্রাসের দ্বৈত চাপে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে । দ্রুত জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজা, রপ্তানি পণ্যের বাজার বহুমুখীকরণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে আতঙ্ক না ছড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। নতুবা মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের আগুন পুড়িয়ে দেবে দেশের সাধারণ মানুষের পকেট ও সঞ্চয়।
অর্থ-বাণিজ্য: ইরানে হামলার ধাক্কায় বড় পতন দেশের পুঁজিবাজারে
আন্তর্জাতিক: খামেনির হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডাক জামায়াতের
আন্তর্জাতিক: যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি ঘাঁটিতে হামলা
সংস্কৃতি: একুশে পদকের অর্থ নেবেন না মোহন রায়হান