বিশ্লেষণ
টানা সাত মাস ধরে দেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানিপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় এমনিতেই চাপে ছিল খাতটি। এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক নতুন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির সামনে আরেক দফা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি, নৌ ও আকাশপথের লজিস্টিক ব্যয়-সব মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক ঝুঁকির ইঙ্গিত মিলছে।
রপ্তানিকারকদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত এই সামুদ্রিক পথটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট। বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ প্রতিদিন এই করিডর দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে সেখানে সামান্য উত্তেজনা বা সামরিক ঝুঁকিও আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ সরাসরি ওই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ রপ্তানি না করলেও বাণিজ্যিক রুট ও জ্বালানিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার কারণে পরোক্ষভাবে বড় ঝুঁকিতে পড়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির প্রায় ২ শতাংশ। পরিমাণে কম মনে হলেও খাতভিত্তিক গুরুত্ব অনেক বেশি। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক, বাকি অংশ মূলত কৃষিপণ্য ও শাকসবজি।
শিল্পপণ্য ও পচনশীল পণ্য- দুই ধরনের রপ্তানিই এই রুট ও আকাশসীমার ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে কিংবা বীমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়ে রপ্তানি ব্যয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান ট্রানজিট হাবগুলো- বিশেষত দুবাই-বাংলাদেশের বাণিজ্য সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেবল একটি গন্তব্য নয়; এটি এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকাকে সংযুক্ত করা বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের অংশ। ঢাকা থেকে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকাগামী অসংখ্য কার্গো ও যাত্রীবাহী ফ্লাইট উপসাগরীয় আকাশসীমা ব্যবহার করে বা সেখানে ট্রানজিট নেয়।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে কিছু এয়ারলাইন ইতোমধ্যে ফ্লাইট পুনর্নির্ধারণ বা সাময়িক স্থগিত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়নপথের ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘতর এবং ব্যয়বহুল। এর ফলে জ্বালানি খরচ বাড়ছে, সময়সূচিতে বিঘ্ন ঘটছে এবং সূক্ষ্মভাবে সমন্বিত বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হচ্ছে।
অর্থনীতির হিসাবে পরিস্থিতি বেশ কঠিন। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা তেলের বাজারে স্নায়ুচাপ তৈরি করেছে। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল যে রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেখানে বিঘ্নের আশঙ্কাই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
যদি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তবে তার প্রভাব বহুমুখী হবে। প্রথমত, জাহাজ ও বিমান পরিবহনের জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। দ্বিতীয়ত, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে চলাচলের ঝুঁকি বিবেচনায় বীমা প্রিমিয়াম বাড়বে। তৃতীয়ত, দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহারের ফলে ফ্রেইট চার্জ ও ট্রানজিট সময় বৃদ্ধি পাবে। সব মিলিয়ে রপ্তানিকারকদের খরচ কাঠামো দ্রুত বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর ও স্বল্প মুনাফাভিত্তিক রপ্তানি অর্থনীতিতে এই বাড়তি ব্যয় সরাসরি প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় আঘাত হানতে পারে। তৈরি পোশাক খাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মূলত কম দামের ওপর জোর দেন। সেখানে পরিবহন ব্যয় বাড়লে তা পুরোপুরি ক্রেতার ওপর চাপানো সম্ভব হয় না। ফলে মুনাফার মার্জিন সংকুচিত হয়।
এমন সময়েই প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা মন্থর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভোক্তা ব্যয় কম থাকায় রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে ধীর। এর ওপর পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যমুখী রপ্তানি নয়, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ বা আফ্রিকায় যাওয়া পণ্যের ট্রানজিট ব্যবস্থাও ব্যাহত হতে পারে। পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে বিলম্ব মানেই সরাসরি ক্ষতি। আর শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে সময়মতো সরবরাহে ব্যর্থতা দীর্ঘমেয়াদে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে তাৎক্ষণিক ও পরোক্ষ- দুই ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয়, বীমা ঝুঁকি, ট্রানজিট অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প রুট, বহুমুখী বাজার অনুসন্ধান এবং জ্বালানি ও লজিস্টিক ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত প্রস্তুতি না নিলে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।
সারাদেশ: সুনামগঞ্জে সার বিক্রেতাদের মানববন্ধন
অর্থ-বাণিজ্য: মধ্যপ্রাচ্য সংকট দেশের রপ্তানি খাতে নতুন হুমকি
অর্থ-বাণিজ্য: দেশের বিমানবন্দরগুলোতে পচে যাচ্ছে পণ্য