মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ঐ অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে এক ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে ৬টি জাহাজে ইরানিদের হামলার পর সেখান দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সিংহভাগ জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই প্রণালি দিয়েই আমদানি হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের একটি সূত্র বলছে, সৌদির রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আরামকো থেকে লোডিং শেষে ২ মার্চ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ক্রুড অয়েলবাহী দুটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল। তবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় জাহাজ দুটি সৌদিতেই বসে রয়েছে। প্রত্যেকটি জাহাকে ১ লাখ টন করে মোট ২ লাখ টন জ্বালানি রয়েছে।
এছাড়া, দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, আগামী ১৫ এবং ১৮ মার্চ কার্গো দুটি বাংলাদেশে পৌঁছার কথা।
কাতার গ্যাসকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা। ফিরতি চিঠিতে কাতার গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সময় কার্গো পাঠানোর ক্ষেত্রে চুক্তিতে যেসব জরুরি অবস্থার শর্ত আচে সেগুলো যুক্ত হতে পারে। তবে তারা এলএনজি পাঠাচ্ছে এটা বলেনি, পাঠাচ্ছে না এমনটাও বলেনি।
এরমধ্যে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে বলে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পেট্রোবাংলা থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে দৈনিক ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার। এতে আগামী ৭ দিনে ১৪০০ এমএমসিএফ গ্যাস সাশ্রয় হবে। সেই গ্যাস দিয়ে বাড়তি কয়েকদিন চালানো যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে যাচ্ছে বলে আগেই ধারণা করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এই প্রেক্ষিতে দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা অনুযায়ি জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে; হ্রাস পেতে পারে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন। গেল বুধবার মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এমনটা উঠে আসে।
দেশে ঈদের আগে শপিং মল, মার্কেট, বিপণি বিতানসহ বিভিন্ন শো-রুমে ব্যাপক আলোকসজ্জা করা হয়। এছাড়া, দেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও জমকালো আলোকসজ্জার প্রথা রয়েছে। শীত চলে যাওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। জ্বালানি সংকটে গ্রীষ্মে লোডশেডিংয়ের বিষয়ে আগে থেকেই একটা আভাস ছিল।
বুধবার বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, এখন থেকে সব ধরেণে আলোকসজ্জ্বা পরিহার করতে হবে। এছাড়া, ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরাধসহ আরও কিছু নির্দেশনা আসে মন্ত্রণালয় থেকে। তবে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হতে চলেছে এমন ধারণায় বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে গড়ায়।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে হয়। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে দেশে জ্বালানি সংকট হবে বলে সভায় আলোচনা হয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে গাড়ির ব্যবহার সীমিত করা, আলোকসজ্জা পরিহার, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এয়ার কন্ডিশনার) তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখাসহ ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই নির্দেশনাপত্র জারি করা হয়। সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, করপোরেশনসহ সব অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে বিপিসির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে ২ মার্চ পর্যন্ত ৭টি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে। জুন পর্যন্ত পরিশোধিত তেল আমদানির চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে। এগুলো চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসবে। তার ভাষায়, “এই রুটে কোন সংকট নেই।”
১১ দফা নির্দেশনা
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনাপত্রে বলা হয়, বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করা প্রয়োজন। সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, করপোরেশনসহ সব অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য নিচের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১. দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার পরিহার করতে হবে। জানালা ও দরজা কিংবা ব্লাইন্ড খোলা রেখে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করতে হবে।
২. বিদ্যমান ব্যবহৃত আলোর অর্ধেক ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাইটের ব্যবহার পরিহার করতে হবে।
৩. অফিস চলাকালে প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাইট, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হবে।
৪. এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখতে হবে।
৫. অফিসকক্ষ ত্যাগ করার সময় কক্ষের বাতি, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ করতে হবে।
৬. অফিসের করিডর, সিঁড়ি, ওয়াশরুম ইত্যাদি স্থানে অপ্রয়োজনীয় বাতি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
৭. বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে।
৮. অফিস সময় শেষ হওয়ার পর সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি (লাইট, ফ্যান, কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি) বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে।
৯. যাবতীয় আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে।
১০. গাড়ির ব্যবহার সীমিত করতে হবে
১১. জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনাপত্রে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্ব-স্ব নিয়ন্ত্রণাধীন সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর বা সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য বলা হয়। ১১ দফা নির্দেশনাপত্র সব সচিব, কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সব কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়।
এরআগে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটার কথা উল্লেখ করে বুধবার বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাময়িক এ সংকট মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ২২ শতাংশের বেশী তেল নির্ভর। গ্যাসভিত্তিক যে ৪৩ শতাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সেগুলোর এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি এলএনজি। এই তেল ও এলএনজির সিংহভাগই আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইসরায়েলের ওপর পাল্টা হামলার পাশপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে স্থাপিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতেও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।
ইরানের ড্রোন হামলার মাধ্যমে পারস্য উপসাগরে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বেশ কয়েক মাস বিঘ্নিত করতে পারে বলে মনে করছেন মার্কিন সামরিক গোয়েন্দারা; এমন খবর দিয়েছে রয়টার্স। বার্তা সংস্থাটির খবরে বলা হয়েছে অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের দাম ১২ শতাংশ ও ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
সার্বিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশের তেল আমদানিতে বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশপাশি পরিবহন খাতেও বড় সংকট তৈরি হবে।