বিশ্লেষণ

জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা থাকলেও দেশে মজুদ নিরাপদ

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা এবং তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পর পারস্য উপসাগর অঞ্চলের পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রতিফলন বাংলাদেশেও দেখা যাচ্ছে। বাজারে আতঙ্কজনিত কেনাকাটা বেড়েছে, ডিলার ও ভোক্তাদের মধ্যে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুদের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে দৈনিক সীমা নির্ধারণ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা কতটা আমদানিনির্ভর, কোথা থেকে এই জ্বালানি আসে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কতটা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি বড় বাস্তবতা হলো- দেশটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে। বিপিসির আমদানিকৃত জ্বালানির মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ আসে অপরিশোধিত তেল হিসেবে, যা চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধন করা হয়। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ তেল আসে আগে থেকেই পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য হিসেবে।

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের জন্য বিপিসি প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল, ১ লাখ ৮৫ হাজার টন জেট ফুয়েল, ১ লাখ টন অকটেন পেট্রোল, ১ লাখ ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল এবং ৩০ হাজার টন মেরিন ফুয়েল। এই আমদানিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৮২ মিলিয়ন ডলার।

এর বাইরে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে অতিরিক্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যার ব্যয় প্রায় ১১৯ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের পুরোটা মূলত দুটি দেশ থেকে আসে- সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টন ‘আরাবিয়ান লাইট’ ক্রুড অয়েল বাংলাদেশে আসে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি অ্যাডনকের মাধ্যমেও তেল আমদানি করা হয়।

এই তেলবাহী জাহাজগুলোর প্রায় সবকটিকেই পারস্য উপসাগর থেকে বের হয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান।

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে পেট্রোচায়না, ইউনিপেক, ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন, পিটিটি (থাইল্যান্ড), পেটকো ট্রেডিং (মালয়েশিয়া) এবং ওকিউ ট্রেডিং (ওমান)। এই কাঠামো থেকে বোঝা যায়- বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নয়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ওপরও নির্ভরশীল।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও দেশে কিছুটা নিরাপদ মজুদ রয়েছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ আছে। এই মজুদ দিয়ে ডিজেলের ১৪ দিনের চাহিদা পূরণ হবে, পেট্রোলের হবে প্রায় ১৫ দিনের, অকটেনের প্রায় ২৮ দিনের, জেট ফুয়েলের প্রায় ৫৫ দিনের, ফার্নেস অয়েলের প্রায় ৯৩ দিনের চাহিদা পূরণ হবে। সব মিলিয়ে বর্তমান ব্যবহারের হারে এই মজুদ দুই থেকে তিন সপ্তাহের চাহিদা পূরণ করতে পারে।

https://sangbad.net.bd/images/2026/March/08Mar26/news/%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A7%81%E0%A6%A6.JPG

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে ইতিমধ্যে তেল ও গ্যাস নিয়ে ১০টি জাহাজ পৌঁছেছে বা পথে রয়েছে। যেগুলোতে মোট প্রায় পৌনে চার লাখ টন জ্বালানি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি, ৪১ হাজার টন এলপিজি ও ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলসহ অন্যান্য জ্বালানি পণ্য।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে আতঙ্কের কিছু কারণ থাকলেও তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকটের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। কারণ, প্রথমত, দেশের কিছু দিনের মজুদ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম বন্দরে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি পৌঁছেছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশই হরমুজের বাইরে থেকেও আসে। তবে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে।

বর্তমান সংকটের মূল কারণ ইরান থেকে তেল আমদানি নয়। কারণ বাংলাদেশ সরাসরি ইরান থেকে জ্বালানি তেল কেনে না। বরং ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু হলো হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা।বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে হয়। বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও এই পথ দিয়ে আসে। ফলে এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।

ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯২ ডলার প্রতি ব্যারেল ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।

প্রথমত, দেশে কয়েক সপ্তাহের জন্য পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম বন্দরে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি পৌঁছেছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানির বড় অংশই এমন দেশ থেকে আসে, যেগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহে বিলম্ব দেখা দিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে এনেছে- একটি ভূরাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন হবে, জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্য করা, কৌশলগত তেল মজুদ বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি আর আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আপাতত দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও এই সংকট আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো বহুলাংশে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি