বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও অতিরিক্ত পণ্য রপ্তানির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে কি না, তা যাচাই করতে বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক ঘোষণায় জানান, উৎপাদন খাতে কাঠামোগত অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদনের বিষয়ে বিভিন্ন দেশের কার্যক্রম, নীতি ও ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনার জন্য তদন্ত শুরু করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১(বি) ধারার আওতায় এ তদন্ত চালানো হবে।
এই তদন্তে দেখা হবে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কার্যক্রম, নীতি বা চর্চা অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি না এবং সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করছে বা বাধা দিচ্ছে কি না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদকে বলেন, ‘তারা হঠাৎ কেন এই তদন্ত শুরু করেছে সেটা আমার বোধগম্য নয়। আর বাংলাদেশের গার্মেন্টস নিয়ে তারা তদন্ত করছে এখন আমরা ইউএসএ’র কোনো বিষয় নিয়ে তদন্ত করতে পারবো কিনা সেটাও দেখার বিষয়। এমন এক পাক্ষিক তদন্ত ডব্লিউটিও’র নিয়ম অনুযায়ি কোনো দেশের বিরুদ্ধে করা যায় কিনা সেটাও একটা বিবেচনার বিষয় বলে আমার মনে হয়।’
বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্ল্যানিং ইকোনমি (কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি) নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ তো সেন্ট্রাল প্ল্যানিং ইকোনমি নয় যে সেটা সরকার নির্ধারণ করবে, কতটুকু উৎপাদন করবে বা কতটুকু উৎপাদন করবে না। তাই এই বিষয়টা আমার অযৌক্তিক মনে হয়েছে। এখন বাংলাদেশ সরকারকে নির্ধারণ করতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্ত নিয়ে তারা কি করবে।’
যেসব দেশকে এ তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে সেগুলো হলো চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, বাংলাদেশ, মেক্সিকো, জাপান ও ভারত।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদনের প্রমাণ রয়েছে বলে । যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পণ্য বাণিজ্যে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত প্রায় ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। এই উদ্বৃত্তের বড় অংশই এসেছে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যসহ মোট ৪৩টি খাতে রপ্তানির জন্য নগদ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পেও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় মন্দার মুখে পড়েছে এ খাত। ২০২৪ সালে দেশে সিমেন্টের মোট ব্যবহার নেমে এসেছে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন টনে, যা মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশেরও কম। ২০২৫ সালেও এ ব্যবহার আরও কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, ‘অন্য দেশগুলো তাদের অতিরিক্ত উৎপাদনের সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঠেলে দেবে, আর যুক্তরাষ্ট্র তার শিল্প হারাবে, এটি আর মেনে নেওয়া হবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্য হলো, গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই চেইন আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদন খাতে টেকশই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুনরায় শিল্পায়নের উদ্যোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। কারণ অনেক দেশ উৎপাদন সক্ষমতা এত বেশি যে তারা নিজেদের দেশে যতটা ব্যবহার করতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশি পণ্য উৎপাদন করছে। ফলে এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এসে স্থানীয় উৎপাদনকে চাপে ফেলছে অথবা নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কমিয়ে দিচ্ছে।
গ্রিয়ার জানান, অনেক খাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ হারিয়েছে অথবা বিদেশি প্রতিযোগীদের তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে পিছিয়ে পড়েছে।
১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১ এমন একটি আইনগত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বিদেশি দেশের অন্যায্য বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কোনো দেশের সরকারি নীতি বা কার্যক্রম যদি অযৌক্তিক, বৈষম্যমূলক বা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়, তাহলে এই ধারার আওতায় তদন্ত ও পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
আইনের সেকশন ৩০২(বি) অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি নিজ উদ্যোগেও সেকশন ৩০১-এর আওতায় তদন্ত শুরু করতে পারেন। এই ধারার অধীনে তদন্তে মূলত যাচাই করা হয় কোনো দেশের নীতি বা কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর অযৌক্তিক প্রভাব ফেলছে কি না বা বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি বিভিন্ন সংস্থা ও পরামর্শক কমিটির মতামত নিয়ে এ তদন্ত শুরু করেছেন। তদন্ত শুরুর পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত সব দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা চেয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ বিষয়ে মতামত গ্রহণের জন্য ১৭ মার্চ থেকে একটি নথিপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু হবে। আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে লিখিত মতামত, শুনানিতে অংশ নেওয়ার আবেদন এবং সাক্ষ্যের সংক্ষিপ্তসার জমা দিতে বলা হয়েছে। এই তদন্ত সংক্রান্ত শুনানি আগামী ৫ মে থেকে শুরু হবে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়।
অর্থ-বাণিজ্য: দ্বিগুণের বেশি দামে তিন কার্গো এলএনজি কিনছে সরকার
অর্থ-বাণিজ্য: আর্থিক হিসাব চলবে পুরোপুরি ডিজিটাল কেওয়াইসি দিয়ে
অর্থ-বাণিজ্য: বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক, ধারে-কাছে কেউ নেই