আগামীকালের মধ্যে কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের দেয়া ৮ দফা দাবি আদায় না হলে আগামী সোমবার থেকে দেশের সব কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এর দায়ভার নিতে হবে বলেও জানানো হয়।
শুক্রবার, (০২ জানুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ‘কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, বর্তমান অবস্থা ও পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। বাংলাদেশ কৃষি ডিপ্লোমা ছাত্র পরিষদ এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
বাংলাদেশ কৃষি ডিপ্লোমা ছাত্র পরিষদের সভাপতি মুসা প্রধান হামজা বলেন, কৃষি এ দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। সেই কৃষিখাতের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে নিয়োজিত কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীরা এখন রাজপথে। কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। দফা দাবি কোনো নতুন, হঠাৎ বা আবেগতাড়িত দাবি নয়। এগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও প্রশাসনের কাছে উপস্থাপিত, নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে আলোচিত এবং কৃষি উপদেষ্টা কর্তৃক একাধিকবার যৌক্তিক বলে স্বীকৃত। এই দাবিগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের জন্য দক্ষ, আধুনিক ও আত্মনির্ভরশীল কৃষি জনশক্তি গড়ে তোলা।
প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা ও প্রতারণার বাস্তব চিত্র উল্লেখ করে মুসা প্রধান হামজা বলেন, আমরা বরাবরই আলোচনায় বিশ্বাস করেছি। সে কারণেই বিদায়ী বছরের ২১ এপ্রিল এগ্রি ব্লকেড কর্মসূচির সময় কৃষি উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের সরাসরি আশ্বাসে আমরা আন্দোলন স্থগিত করি। পরে ৯ ডিসেম্বর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সামনে দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপন ও বাস্তবায়ন কমিটি প্রকাশের আশ্বাস দেয়া হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, একটিও দাবির বাস্তবায়ন হয়নি। কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি, দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বরং নথিপত্র চালাচালি, সভা আর সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতকে অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীরা আন্দোলন প্রত্যাহার ও দাবি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে সশরীরে উপস্থিত হয়। এ সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা আন্দোলন করো, আমাদের কিছু করার নেই।’ আমরা সুস্পষ্টভাবে প্রশ্ন রাখতে চাই, এটি কি একটি রাষ্ট্রীয় দপ্তরের দায়িত্বশীল বক্তব্য হতে পারে? তাহলে এতদিন আশ্বাস দেয়া হলো কেনো। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই দায়হীনতা কার স্বার্থ রক্ষা করছে? এই বক্তব্য শুধু দায়িত্বহীন নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দপ্তরের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দায় এড়ানোর মানসিকতা এবং এটা শিক্ষার্থীদের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ। বর্তমান আন্দোলনের দায় কার উল্লেখ করে কৃষি ডিপ্লোমা ছাত্র পরিষদের সভাপতি মুসা প্রধান বলেন, আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিতে চাই, শিক্ষার্থীরা শখে আন্দোলনে নামেনি। পরীক্ষা বর্জন কোনো আনন্দের সিদ্ধান্ত নয়।
জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু অধিকারহীন ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্লাসে ফেরার কোনো নৈতিক বা বাস্তব ভিত্তি নেই। এই পরিস্থিতির সম্পূর্ণ দায়, দীর্ঘদিনের গড়িমসি, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার এই দায় শিক্ষার্থীদের নয়, এই দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। দাবি বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন ছাড়া আন্দোলন বন্ধ হবে না, আন্দোলন দমন কোনো সমাধান নয়, দাবি বাস্তবায়নই একমাত্র পথ।
এ সময় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করে তিনি বলেন, আগামী রোববারের (আগামীকাল) মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী সোমবার থেকে সব কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হবে। এই বিষয়ে পরবর্তীতে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী হামলা, মামলা, হুমকি বা প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে কোনো অপ্রতিকর ঘটনার সৃষ্টি হলে এর দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।
### শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো- ডিপ্লোমা কৃষিবিদদের স্বতন্ত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে গেজেট করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে এবং প্রতিবছর নিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষক সংকট দূর করতে হবে।
কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষাকে ডিএই-এর অধীনস্থ থেকে বের করে সম্পূর্ণভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আলাদা প্রতিষ্ঠান করতে হবে। সব কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক সহকারী কর্মকর্তা পদটি শুধুমাত্র ডিপ্লোমা কৃষিবিদদের জন্য সংরক্ষিত করতে হবে। ডিপ্লোমা কৃষিবিদদের বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে পে-স্কেলে ন্যূনতম ১০ম গ্রেডের বেতন দিতে হবে। কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের মাঠ সংযুক্তি ভাতা প্রদান করতে হবে। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের চাকরিতে প্রবেশের পর ৬ মাসের ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।