ত্রিমুখী আন্দোলনের মুখে সাত কলেজ নিয়ে প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ আইনে বড় পরিবর্তন আসছে। এবার খসড়া আইনে সাত কলেজকে এই ইউনিভার্সিটির ‘সংযুক্ত’ কলেজ হিসেবে ‘সর্ম্পকিত’ রাখার কথা বলা হয়েছে।
‘অক্ষুণœ’ থাকবে কলেজগুলোর ‘বিরাজমান পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা’
অধ্যাদেশের দাবিতে আজ তিন স্থানে ‘অবরোধ’ ঘোষণা শিক্ষার্থীদের
‘সংযুক্ত কলেজসমূহের বিরাজমান পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও অন্যান্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকিবে’ বলে সংশোধিত খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূলত এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে না এমন শঙ্কা প্রকাশ করেই সাত কলেজের শিক্ষকরা (বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার) আন্দোলন করে আসছিল। একাদশ শ্রেণীতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন করে আসছিল।
সাত কলেজের শিক্ষকদের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঢাকা কলেজের দু’জন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেছেন, তারা জানতে পেরেছেন ‘চূড়ান্ত’ খসড়া আইনে সাত কলেজের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণœ রাখার কথা সংযুক্ত করা হয়েছে। এজন্য আপাতত আন্দোলন স্থগিত রাখা হয়েছে। সম্প্রতি একাদশ শ্রেণীর ক্লাশ শুরু করেছেন শিক্ষকরা।
ওই শিক্ষকরা আরও জানান, তারা ‘শাটডাউন’ কর্মসূচির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুযায়ী ক্লাশ নিচ্ছেন। তারা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ জারির অপেক্ষায় আছেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একটি পক্ষ আইনে সাত কলেজের সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না বলেও দুই শিক্ষকের দাবি।
যে কারণে আন্দোলন
গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে সাতটি কলেজকে চারটি স্কুলে বিভক্ত করে ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি’ বা ‘স্কুলিং’ কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী কলেজগুলোতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠদানও চালু থাকবে।
তবে প্রস্তাবিত কাঠামোতে সাতটি কলেজসহ সারাদেশের সরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদোন্নতির মতো মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন। তারা কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ‘অধিভুক্তিমূলক কাঠামোতে’ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন।
আর কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের একাংশ প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টির আইনি কাঠামো দ্রুত নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে অধ্যাদেশ জারির দাবি জানাচ্ছেন।
এছাড়া উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একাংশ প্রস্তাবিত কাঠামোর বিরোধিতা করে বলছেন, স্কুলিং কাঠামোতে কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে না।
২০১৭ সালে যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়াই ঢাকা মহানগরের সাত সরকারি কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এই কলেজগুলো হলো- ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ।
এর মধ্যে ইডেন ও তিতুমীরে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়; বাকি পাঁচটি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর তিন স্তরেই পাঠদান হয়। এগুলোতে শিক্ষার্থী দেড় লাখের মতো। চলতি শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথমবর্ষে ভর্তিযোগ্য আসন ১১ হাজারের মতো। সাত কলেজে মোট শিক্ষক হাজারের বেশি।
গত ৮ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির’ প্রথম ব্যাচের (২০২৪-২৫) ক্লাস ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা জানায়। এরপর শিক্ষকরা ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।
ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশের দাবিতে আজ তিন স্থানে ‘অবরোধ’
প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গঠনের লক্ষ্যে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারির এক দফা দাবিতে আজ রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবরোধ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার, (১৩ জানুয়ারী ২০২৬) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর আন্দোলনের’ পক্ষ থেকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বুধবার (আজ) সকাল ১১টায় রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, টেকনিক্যাল ও তাঁতীবাজার মোড় অবরোধ করা হবে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, আগামীকাল অনুষ্ঠেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভাতেই ‘ঢাকা সেন্ট্রাল অনুমোদন দিতে হবে এবং পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।
সাত কলেজের সমন্বয়ে ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত আইনের খসড়া গত ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, এরপর বিভিন্ন পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়াটি হালনাগাদ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সর্বশেষ গত ৭ ও ৮ ডিসেম্বর শিক্ষা ভবন অভিমুখে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেছিল যে, ডিসেম্বরের মধ্যে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকেই অধ্যাদেশ জারি করা হবে। তারা (আন্দোলনকারীরা) একটি সূত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে, আগামীকাল উপদেষ্টা পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হবে।
তাই ওই সভাতেই চূড়ান্ত অনুমোদনের দাবিতে রাস্তায় নামছেন শিক্ষার্থীরা। উক্ত তারিখের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে ব্যত্যয় ঘটলে যৌক্তিক দাবি আদায়ে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।