গ্যাস না পেয়েও বিলের বোঝা এলাকাবাসীর ঘাড়ে
নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত-কোনোভাবেই গ্যাস সরবরাহ না করে গত ১৬ বছরে শিবালয় ও মানিকগঞ্জ অঞ্চলের জনগণের কাছ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিল আদায় করেছে তিতাস গ্যাস কোম্পানি এমন অভিযোগ উঠেছে। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়মিত গ্যাসের দাবিতে আলোচনা, মিছিল-মিটিং ও আন্দোলন করেও কোনো সুফল পায়নি আবাসিক গ্রাহকরা। বরং গ্যাসের দাবিতে মিছিল করলে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন অনেক সাধারণ গ্রাহক। মিথ্যা মামলায় জেল-জুলুম ও হয়রানির শিকার হয়েছেন জেলার অসংখ্য গ্রাহক। অভিযোগ রয়েছে, তিতাসের চাপে দিশেহারা সাধারণ গ্রাহকরা এখনও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাতেও নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
২০১০ সাল থেকেই জেলায় গ্যাস সরবরাহ কমতে থাকে। ২০১২ সালের প্রথম দিকে আবাসিক গ্রাহকরা সপ্তাহে শুধু শুক্রবার গ্যাস পেতেন। কিন্তু ওই বছরের ছয় মাস না যেতেই গ্যাস সরবরাহ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। গ্যাস না পেয়েও বছরের পর বছর নিয়মিত বিল দিতে বাধ্য হওয়ায় গ্রাহকরা চরম অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েন। এই প্রেক্ষাপটে ২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবিতে সাধারণ গ্রাহকদের মিছিলে পুলিশের টিয়ারশেল ও গুলিতে দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকসহ সাধারণ জনগণ আহত হন।
তিতাস গ্যাস মানিকগঞ্জ অঞ্চলের ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের দৈনিক চাহিদা ২২.৬ এমএমসিএফডি, কিন্তু আমরা পাচ্ছি মাত্র ১১.৮ এমএমসিএফডি। প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে প্রায় ১১ এমএমসিএফডি। আবাসিকে প্রতি এমএমসিএফডি গ্যাসের দাম ১৮ টাকা এবং সিএনজি পাম্পে ৩৫ টাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা মারা গেছেন, তাই এর বেশি আপাতত বলতে পারবো না’ এ কথা বলে তিনি কল কেটে দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী জানান, এই এলাকায় আবাসিক ডাবল চুলার সংখ্যা ১৩,০৭৩টি এবং একক (সিঙ্গেল) চুলা ১,১০৯টি। ডাবল চুলার মাসিক বিল ১,০৮০ টাকা এবং সিঙ্গেল চুলার বিল ১,০০০ টাকা। এছাড়াও রয়েছে ১৭টি সিএনজি পাম্প ও ৪৩টি শিল্পকারখানার গ্যাস সংযোগ। শুধু আবাসিক খাতে মাসে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং বছরে প্রায় ১৯ কোটি টাকা বিল আদায় করা হয়। এই হিসেবে গত ১৬ বছরে (মাঝে মধ্যে অল্প গ্যাস থাকলেও তা এক বছর পূর্ণ সরবরাহের সমান নয়) শুধু আবাসিক গ্রাহকদের কাছ থেকেই প্রায় ২৮৫ কোটি টাকা বিল আদায় করা হয়েছে গ্যাস না দিয়েই। শিল্পকারখানা ও সিএনজি পাম্পের বিল যোগ করলে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
তিনি আরও জানান, আশুলিয়ার সিএমবি রোড ডিআরএস (প্রেসার নিয়ন্ত্রক) থেকে সাভার-মানিকগঞ্জ হয়ে আরিচাঘাট পর্যন্ত গ্যাস লাইন রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সংযোগ থাকলে বিল দিতেই হবে। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। তবে যারা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে আসছেন, আমরা তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি।’ এ পর্যন্ত শতাধিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং আরও আবেদন রয়েছে। গ্যাস না দিয়েই বিল আদায়ের বিরুদ্ধে তিতাস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিটও হয়েছে বলে তিনি জানান। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগবে তা তিনি বলতে পারেননি।
পৌর এলাকার এক গ্রাহক বলেন, ‘প্রায় ১৬ বছর ধরে গ্যাস নেই, অথচ বিল নেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সিলিন্ডার গ্যাস সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সরকার নির্ধারণকৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১,৪৯৮ টাকা হলেও নেয়া হচ্ছে ২,৭০০-২,৮০০ টাকা। আমাদের ওপর এই জুলুম দেখার কেউ নেই!’
গৃহিণী মোমেনা ও নাছিমা বলেন, ‘প্রায় ১২ বছর আগে গভীর রাতে মাঝে মধ্যে গ্যাস আসতো। আমরা রাত জেগে রান্না করতাম। এখন গ্যাস নেই, অথচ কোম্পানি নিয়মিত বিল নিচ্ছে। এটা কি নাগরিকদের সঙ্গে অন্যায় নয়?’
আরুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. শুকুর আলী শিকদার বলেন, ‘দীর্ঘদিন গ্যাস না দিয়ে বিল নেয়া জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এর প্রতিকারে বর্তমান সরকারের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।’
শিবালয় উপজেলার সাবেক ব্যাংকার মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমার বাসায় ৮টি লাইন ছিল। আগেই ৭টি কাটা হয়েছে। সর্বশেষটিও বিচ্ছিন্ন করার আবেদন করেছি। গ্যাস না পেয়ে আর কতদিন বিল দেবো?’
গোয়ারিয়া গ্রামের স্কুলশিক্ষক মো. হাবিবুর রহমানসহ আরও চারজন সংযোগ বিচ্ছিন্নের আবেদন নিয়ে তিতাস কার্যালয়ে ঘুরছেন।
মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মো. শাহনুর ইসলাম বলেন, ‘যেহেতু পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে সিলিন্ডার গ্যাসে ভর্তুকি দিয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বিক্রি করা উচিত। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার গ্যাস না দিয়েই বিল নেয়ার রেওয়াজ চালু করেছিল, যা এখনো চলছে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আমিও গুলিবিদ্ধ হয়েছিলাম।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) মানিকগঞ্জ জেলা সভাপতি এবিএম সামসুন্নবী তুলিপ বলেন, ‘সারাদেশে মাত্র ৪৫টি কোম্পানি সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার যেই থাকুক, তারা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ায়। বর্তমানে সরকার নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় কোম্পানিগুলো সুযোগ নিচ্ছে।’
জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল বলেন, ‘সিলিন্ডার গ্যাসের অতিরিক্ত দামের অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। ওমেরা, বেক্সিমকো ও বসুন্ধরা অবৈধভাবে বেশি দাম নেয়ার অভিযোগে তাদের হেড অফিসে ডেকে নির্ধারিত দামে বিক্রির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবসায়ী নাভান এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. আবু বক্কার বলেন, ‘দাম বেশি হওয়ায় আমরা সিলিন্ডার তুলছি না।’
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘তিতাস গ্যাস সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে এবং তারা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে। তবে গ্যাস না দিয়ে বিল নেয়া ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। সিলিন্ডার গ্যাসের অতিরিক্ত দামের বিষয়ে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও নেব।’
মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মো. জামিলুর রশিদ খান বলেন, ‘মানুষ বিল দেবে কিন্তু গ্যাস পাবে না, আবার গ্যাসের দাবিতে মিছিল করলে গুলি ও মামলা এটাই ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চরিত্র।’
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গুডলাক সিএনজি পাম্পের জিএম মো. আব্দুল্লাহ আল কাফি ও রুমি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার বাবুল বলেন, ‘গ্যাসের অভাবে গাড়িতে গ্যাস দিতে পারছি না, অথচ মাসে সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা বিল দিতে হচ্ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিতাসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্যাস নেই, তারপরও প্রভাবশালীরা নতুন শিল্প সংযোগ নিচ্ছেন আমাদের কিছু করার থাকে না।’
শিবালয় ও মানিকগঞ্জ অঞ্চলের শতাধিক আবাসিক গ্রাহক নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ এবং প্রয়োজনে প্রতিটি সংযোগে মিটার স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। গ্যাস না পেয়েও নিয়মিত বিল দেওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান তারা। স্থানীয় গ্রাহকদের প্রত্যাশা, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।