চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর দেশে নানামুখী সংস্কার ও পরিবর্তনের উদ্যোগ এলেও মানবাধিকার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং রাজনৈতিক সহিংসতা, মব হামলা, সাংবাদিক নির্যাতন, সীমান্তে হত্যা, বিচারবহির্ভূত মৃত্যু এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
বুধবার, (০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) প্রকাশিত সংস্থাটির ১৭ মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামের সই করা প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী- দলীয় আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সংঘর্ষ, নির্বাচন ও চাঁদাবাজিকে ঘিরে ১,৪১১টি সহিংস ঘটনায় ১৯৫ জন নিহত ও ১১ হাজার ২২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১৩৪, আওয়ামী লীগের ২৬, জামায়াতের ৫, ইউপিডিএফের ৬ জনসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী রয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২১৬টি ঘটনায় আরও ৭ জন নিহত ও ১,৪০৩ জন আহত হয়েছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩৪৯টি মামলায় প্রায় ২৯ হাজার ৭৭২ জনের নাম উল্লেখ করে ৬৫ হাজারের বেশি অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে ৫৫ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা
চুরি, ডাকাতি, ধর্মীয় অবমাননা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ৪১৩টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ২৫৯ জন নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হয়েছেন। এইচআরএসএসের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ করে পুলিশের দায়িত্ব পালনে ভীতি ও অনীহা পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সাংবাদিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
গত ১৭ মাসে ৪২৭টি হামলায় অন্তত ৮৩৪ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন নিহত, ৩৭৯ জন আহত, ৯১ জন লাঞ্ছিত ও ১০৩ জন হুমকির মুখে পড়েন এবং ৩৩ জন গ্রেপ্তার হন। সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে ৪১টি মামলায় ৩৩ জন গ্রেপ্তার এবং ৬৯ জন অভিযুক্ত হয়েছেন। সভা-সমাবেশে বাধা, ১৪৪ ধারা জারি ও সংঘর্ষে ৫৪৮ জন আহত ও ৩৬ জন আটক হয়েছেন।
হেফাজতে মৃত্যু ও বিচারবহির্ভূত হত্যা
পুলিশি হেফাজত, নির্যাতন, কথিত বন্দুকযুদ্ধ ও সংঘর্ষে ৬০ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে অসুস্থতা, আত্মহত্যা ও নির্যাতনে ১২৭ জন বন্দি (৪৪ কয়েদি ও ৮৩ হাজতি) মারা গেছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন
১৭ মাসে ২,৬১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ১,০১৬ জন, যার মধ্যে ৫৫০ জনই শিশু। ২৩০ জন গণধর্ষণের শিকার এবং ৩৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। যৌন নিপীড়নের শিকার ৫০৪ জন, যৌতুক ও পারিবারিক সহিংসতায় বহু প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া ১,৮০২ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৪৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সীমান্ত ও সংখ্যালঘু পরিস্থিতি
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ৪৩ জন নিহত, ৪৯ জন আহত ও ১৮৬ জন আটক হয়েছেন। পুশইনের শিকার হয়েছেন অন্তত ৩,৫০৯ জন। মায়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির হামলায় ৩ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হয়েছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলায় মন্দির, প্রতিমা ও বসতবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
শ্রমিক নির্যাতন
৫৩১টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৬৪ জন নিহত ও ১,৪৪৮ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আরও ২৫৮ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
সংস্থার উদ্বেগ ও সুপারিশ
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, নির্বাচনী উত্তেজনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সারাদেশ: দুপচাঁচিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় যুবক নিহত