image

দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের সামান্য উন্নতি: টিআইবি

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিচারে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। তাতে তাদের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি ঘটেছে এক ধাপ। দুর্নীতির এই ধারণা সূচকের (সিপিআই) ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বিশ্বের ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৫০ নম্বরে। গতবার এ তালিকায় বাংলাদেশ ১৫১ নম্বরে ছিল। আবার অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৮২ দেশের মধ্যে ১৩তম। গতবছর ছিল ১৪তম অবস্থানে। ১০০ ভিত্তিতে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর এক বছরে এক পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ২৪।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মঙ্গলবার,(১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এবারের প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক এবং বাংলাদেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি তুলে ধরেন। বিশ্বের ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের ২০২৫ সালের দুর্নীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বার্লিনভিত্তিক সংস্থা টিআই মঙ্গলবার তাদের এই বার্ষিক সূচক প্রকাশ করেছে।

টিআইবি মনে করছে, এ বছর বাংলাদেশের এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহৃত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব’ কাজ করেছে। ‘তবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রের মেয়াদভুক্ত ছিল না। তাই রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি না হওয়ায় আদতে বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থানের খুব একটা ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি।’

গতবারের মতোই এ সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে বাজে অবস্থায় আছে কেবল মায়ানমার ও আফগানিস্তান। ১৬ স্কোর নিয়ে দুটি দেশই ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভাল থেকে খারাপ) রয়েছে তালিকার ১৬৯ নম্বরে।

গতবারের মতোই এ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ভুটান। ৭১ স্কোর নিয়ে ভুটানের অবস্থান সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী ১৮ নম্বরে। এরপর ভারত ও মালদ্বীপ ৯১ (স্কোর ৩৯), শ্রীলঙ্কা ১০৭ (স্কোর ৩৫), নেপাল ১০৯ (স্কোর ৩৪) ও পাকিস্তান ১৩৬তম (স্কোর ২৮)। ২৪ স্কোরে বাংলাদেশের সঙ্গে সূচকের একই অবস্থানে রয়েছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও প্যারাগুয়ে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকে এই সূচকে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম স্কোর ছিল ২০২৪ সালে, ২৩। অর্থাৎ, দুর্নীতি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এক যুগের মধ্যে তখনই সবচেয়ে বাজে ছিল।

এই সময়ের মধ্যে ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৬, এরপর প্রতিবছর স্কোর কমেছে ১ পয়েন্ট করে। ২০১৭ সালের ২৮ ছিল এই সময়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্কোর।

টিআই এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের সূচকে ১৮২টি দেশের গড় স্কোর গতবারের মতোই ৪২। তালিকায় এবার সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে আফ্রিকার দেশ সাউথ সুদান; তাদের স্কোর ৯। এরপরে রয়েছে যথাক্রমে সোমালিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইয়েমেন, লিবিয়া, ইরিত্রিয়া, সুদান, নিকারাগুয়া, সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনি।

টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টাদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতির বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা। জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক এ সরকারের ‘ব্যর্থতার’ নানা বিষয়ে কথা বলেন। দুর্নীতি কমাতে না পারার ব্যর্থতার দায় অন্তর্বর্তী সরকারকে দেবেন কিনা এই প্রশ্নে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের এই প্রত্যাশা ছিল যে এই মেয়াদে তারা একটা ভিত্তি তৈরি করবে। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্যই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তারা রাষ্ট্র সংস্কার করে ফেলবে এই প্রত্যাশা কিন্তু আমাদের ছিল না।’

অন্তর্বর্তী সরকারের এই ‘ব্যর্থতার’ সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘পুরনো সংস্কৃতিতে ফিরে আসার’ বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘সারাদেশে দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, গ্রেপ্তার বাণিজ্য এগুলো কারা করেছে? আমলাতন্ত্রের মব কারা করেছে?’

রাজনৈতিক মন্ত্রী নন, অরাজনৈতিক উপদেষ্টারাই যে এখন মন্ত্রণালয় চালান, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে একজন সাংবাদিক জানতে চান, আমলাদের দুর্নীতির সঙ্গে উপদেষ্টাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো যোগ পাওয়া গেছে কিনা।

ইফতেখারুজ্জামান তখন বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের কারও কারও দুর্নীতি আলোচিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো অবস্থান নেয়নি, প্রকাশ্যে বলেইনি যে, দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন কিছু টানাহেঁচড়া করেছে, ‘অনুসন্ধান করছি বা করবো’ এরকম বলেছে। কিন্তু বাস্তবে কিছু হয়নি।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মৌলিক চাহিদাটা কী ছিল? তারা এমন একটা সরকার চেয়েছিল যারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্য যে প্রস্তাবগুলো বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উত্থাপিত হয়েছিল, সেগুলোর প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে বড় রাজনৈতিক দলগুলো। এবং শেষ পর্যন্ত নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। অর্থাৎ তারা কিন্তু চায় না জনগণের কাছে একটা জবাবদিহিতামূলক সরকার। এই যে দুইটা শক্তির ব্যর্থতা, এসব কারণে কিন্তু আমরা প্রত্যাশিত জায়গায় যেতে পারিনি।’

এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্যই স্বচ্ছতার চর্চা করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, এ সরকার আসার পরপর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের পাঁচটির মতো সংস্থা ‘নানা সুবিধা ও লাইসেন্স’ পেয়েছে। কর মাফ, ডিজিটাল ওয়ালেট, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্সের অনুমোদন, গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন- এসবের সঙ্গে ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টের’ বিষয় আছে। আরও কয়েকজন উপদেষ্টার দুর্নীতির কথা আসছে। এসবের কারণেই সুযোগের উন্নতি ঘটেনি কিনা জানতে চান ওই সাংবাদিক।

জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই সরকার স্বার্থের দ্বন্দ্বের জায়গায় আরেকটা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। কোনটা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ আর কোনটা ব্যক্তিগত স্বার্থ, সেই বিভাজন করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এই দুইটা স্বার্থের মধ্যে বিভাজন করতে না পারলে দায়িত্বই নেয়া উচিত না। আপনারা দায়িত্ব নিয়েছেন, কিন্তু এই বিভাজন করতে পারেননি। ব্যক্তি স্বার্থকে সরকারি স্বার্থের সঙ্গে একাকার করেছেন। ব্যক্তি স্বার্থকে প্রমোট করার জন্য সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।’

‘অপরাধ ও দুর্নীতি’ : আরও খবর

» গৃহকর্মী নির্যাতন: বিমানের এমডি ও স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার ৪ জন কারাগারে

সম্প্রতি