এক্সপ্লেইনার
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, “সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না।’ মন্ত্রী বলেন, ‘তারা সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা তুলছে।’
সড়কমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি আইনের দৃষ্টিতেও প্রশ্ন উঠেছে, সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা অর্থ কি চাঁদাবাজি নয়? নাকি নির্দিষ্ট শর্তে তা বৈধ হতে পারে?এই বিতর্ক বোঝার জন্য দেখতে হবে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮–এর ৩৮ ধারা কী বলছে। আর সেই ধারার সঙ্গে ফৌজদারি আইনের সম্পর্ক কোথায়।
৩৮ ধারা কী বলছে
আইনের ৩৮(১) ধারায় বলা উল্লেখ রয়েছে, টার্মিনাল উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার ব্যয় নির্বাহের জন্য কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল চার্জ নির্ধারণ করতে পারবে। অর্থাৎ চার্জ নির্ধারণের ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের।
৩৮(২) ধারায় আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, উপধারা (১)-এ নির্ধারিত টার্মিনাল চার্জ ছাড়া, টার্মিনালে কোনো পরিবহন প্রবেশ বা বাহিরের সময়, কিংবা সড়ক–মহাসড়ক–পাবলিক প্লেসে চলাচলের সময় অন্য কোনো অর্থ আদায় করা যাবে না।
মূল প্রশ্ন
যদি মালিক বা শ্রমিক সমিতি “সমঝোতার ভিত্তিতে” নির্দিষ্ট হারে টাকা তোলে, অথচ সেই হার সরকার নির্ধারিত না হয়, তাহলে সেটি কি ৩৮(২) ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক?আইনের ভাষা বলছে, সরকার নির্ধারিত চার্জের বাইরে অন্য অর্থ আদায় নিষিদ্ধ। সেখানে “সমঝোতা” শব্দটি কোনো ব্যতিক্রম হিসেবে নেই।
সমঝোতা কি চাঁদাবাজিকে বৈধ করে
নবনিযুক্ত সড়ক পরিবহন মন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন, চাঁদা হলো সেটি, যা জোর করে আদায় করা হয়। কেউ দিতে না চাইলে বাধ্য করা হলে সেটাই চাঁদা। অথচ, ফৌজদারি আইনে চাঁদাবাজির সংজ্ঞা শুধু খোলাখুলি জোরজবরদস্তিতে সীমাবদ্ধ নয়।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৮৩ ধারায় ‘চাঁদাবাজি’ বলতে বোঝানো হয়েছে, ভয় প্রদর্শন করে বা ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে কারও কাছ থেকে সম্পদ আদায়। সরাসরি মারধর না হলেও, অপ্রকাশ্য চাপ, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, লাইনে দাঁড়াতে না দেওয়া, গাড়ি না ছাড়ার ইঙ্গিত- এসবও আইনগতভাবে ‘ভয় প্রদর্শন’–এর পরিসরে পড়তে পারে।
প্রশ্নটা হচ্ছে, বাস-মালিক বা চালক যদি মনে করেন, টাকা না দিলে রুটে সমস্যা হবে, তাহলে সেই ‘সমঝোতা’ কতটা স্বতঃস্ফূর্ত হয়? অথচ আইনের চোখে স্বেচ্ছা অনুদান আর প্রভাবিত সম্মতি এক জিনিস নয়।
সমিতির তহবিলের বৈধতার সীমানা
পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন তাদের সদস্যদের কল্যাণে তহবিল গঠন করতে পারে। এটি শ্রম আইনের আওতায় বৈধ। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, সেখানে প্রথমত, সদস্যদের স্বেচ্ছা সম্মতি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থ আদায়ের হার ও প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ। তৃতীয়ত, সদস্য নয়, এমন ব্যক্তিদের ওপর বাধ্যতামূলক আরোপ করা যাবে না। চতুর্থত, সরকারি ফি বা চার্জের বিকল্প হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
যদি কোনো পরিবহন সমিতি টার্মিনালে ঢোকার সময় সবার কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্ক নেয় এবং সেটি না দিলে গাড়ি প্রবেশে বাধা আসে, তাহলে সেটি কল্যাণ তহবিল নয়, বরং অননুমোদিত চার্জ হিসেবে গণ্য হতে পারে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮–এর ৩৮ ধারা অনুযায়ী, টার্মিনাল চার্জ নির্ধারণের এখতিয়ার রাষ্ট্রের। অতএব, সমিতি যদি সেই জায়গায় নিজস্ব হার বসায়, তা আইনের সঙ্গে সংঘর্ষে যেতে পারে।
‘অলিখিত বিধি’ না লিখিত আইন
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেছেন, সড়কে টাকা আদায় করা এক ধরনের “অলিখিত বিধি”। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অলিখিত চর্চা কখনোই লিখিত আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইন যখন স্পষ্টভাবে বলছে, সরকার নির্ধারিত চার্জ ছাড়া অন্য অর্থ আদায় করা যাবে না, তখন অলিখিত প্রথা আইনের ব্যতিক্রম হতে পারে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব
যদি সড়কে টাকা আদায় বৈধ হয়, তাহলে সেটিকে নিয়ম, অডিট, জবাবদিহি নিশ্চিত করে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। আর যদি অবৈধ হয়, তাহলে তা বন্ধ করতে হবে। বিকল্প কল্যাণ কাঠামো তৈরি করতে হবে।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮–এর ৩৮ ধারা লঙ্ঘন করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এই ধরনের অপরাধকে দণ্ডবিধির অধীনে “চাঁদাবাজি” হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, এটি কেবল প্রশাসনিক লঙ্ঘন নয়, ফৌজদারি অপরাধেও রূপ নিতে পারে। তবে বাস্তব প্রশ্ন হলো, এ ধরনের আদায় কি কখনো নিয়মিতভাবে মামলায় রূপ নেয়, নাকি রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সমঝোতার মধ্যে থেকে যায়?
বিতর্কের কেন্দ্রে দ্বন্দ্ব
সড়কে সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া চাঁদা নয়- ইস্যুতে মূল দ্বন্দ্ব তিনটি স্তরে রয়েছে। প্রথমত, আইনি দ্বন্দ্ব। যেখানে ৩৮ ধারা বনাম সমিতির প্রথা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বাস্তবতা। যেখানে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব ও সংগঠনের আধিপত্য। তৃতীয়ত, নৈতিক প্রশ্ন। যাত্রীদের ভাড়া কি পরোক্ষভাবে এই টাকার ভার বহন করছে?
যদি পরিবহন মালিকদের ওপর আরোপিত অর্থ শেষ পর্যন্ত ভাড়ায় যোগ হয়, তাহলে ভোক্তাই এর চূড়ান্ত মূল্য দেয়। তখন এটি শুধু সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না, জনস্বার্থের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে আইনের ভাষায় সংক্ষেপে বলা যায়, সরকার নির্ধারিত টার্মিনাল চার্জ ছাড়া অন্য অর্থ আদায় ৩৮ ধারা অনুযায়ী নিষিদ্ধ। আরও বলা যায়, ‘সমঝোতা’ থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না। শেষে বলা যায়, প্রভাবিত সম্মতি থাকলে তা দণ্ডবিধির চাঁদাবাজির সংজ্ঞায় পড়তে পারে।
এখন মূল বিষয়টি নির্ভর করবে, সড়কে অর্থ আদায় আসলে কীভাবে হচ্ছে? না দিলে কী হয়? সরকার তা অনুমোদন করেছে কি না? এসব তথ্যের ওপর।ফলে বলা যায়, সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হতে পারে। তবে আইনের ব্যাখ্যা নির্ভর করবে প্রমাণ, প্রক্রিয়া ও ক্ষমতার কাঠামোর ওপর। শেষ প্রশ্নটা থেকেই যায়, যেখানে লিখিত আইন আছে, সেখানে ‘অলিখিত প্রথা’ কতদিন, কীভাবে টিকে থাকতে পারবে?