সড়কে পরিবহনের চাঁদা আসে জনগণের পকেট থেকে

মৌমিতা মাসিয়াত

দেশের সড়ক পরিবহন খাতে “চাঁদা” শব্দটি বহুদিনের পরিচিত। কখনও মালিক-শ্রমিক সংগঠনের কল্যাণ তহবিল, কখনও টার্মিনাল ফি, কখনও রুটভিত্তিক চাঁদাসহ বিভিন্ন নামে অর্থ আদায়ের সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তবে অর্থনীতির সহজ হিসাব বলছে, এই অর্থ শেষ পর্যন্ত মালিকের পকেট থেকে নয়, যাত্রীর ভাড়ার মধ্য দিয়েই আদায় হয়।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয়ের বাইরে যেকোনো ‘ছায়া’ খরচই অবৈধ। চাঁদা কিংবা কল্যাণ খরচ যেভাবেই দেখানো হোক না কেন, তা জনগণের ওপর চাপ তৈরি করে।

উচ্চ আদালত থেকে সড়কে টোল আদায় বন্ধের নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হয় না। ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই হাইকোর্ট সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ এলাকায় নির্ধারিত টার্মিনাল ছাড়া মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বাস-ট্রাকসহ যন্ত্রচালিত যান থেকে টোল আদায় বন্ধে নির্দেশ দিয়েছে। আদালত জানতে চায়, নির্ধারিত টার্মিনালের বাইরে এভাবে টোল আদায় কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।

শুধু কি উচ্চ আদালত, পরিবহন আইনও একই কথা বলছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮–এর ৩৮ ধারায় টার্মিনাল উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার বা কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত চার্জ ছাড়া অন্য অর্থ আদায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি অনুমোদন ছাড়া সড়কে বা টার্মিনালে অতিরিক্ত অর্থ আদায় আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এই অবস্থায় মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে আদায় করা অর্থ বৈধ কি না, তা নির্ভর করে সেটি সরকার নির্ধারিত কি না আর আদায়ের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ কি না তার ওপর।

চাঁদাবাজির “বৈধতার” ইতিহাস

পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি নতুন কিছু নয়। ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যাতে সংগঠনগুলো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে চাঁদা তুলতে পারে। পরে ২০১১ সালের দিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সেই সুপারিশ সংশোধন করে নতুন খসড়া করা হয়। সেখানে মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন ও ফেডারেশনকে নির্দিষ্ট অঙ্কে চাঁদা তোলার প্রস্তাব ছিল।

তবে সমালোচনার মুখে কোনো সরকারই তাতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়নি। ফলে আইনি স্বীকৃতি না থাকলেও বাস্তবে চাঁদা তোলার প্রথা বহাল থাকে। অনেক জায়গায় “৭০ টাকা” নির্ধারিত চাঁদা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়। যার সঙ্গে যুক্ত হয় আরও নানা অনানুষ্ঠানিক আদায়। অর্থাৎ, আইনি কাঠামো স্পষ্ট না থাকলেও প্রশাসনিক সহনশীলতায় প্রথাটি টিকে গেছে।

বছরে চাঁদাবাজি ১,০৫৯ কোটি

২০২৪ সালের ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল বলছে, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। এই অর্থের ভাগ পান রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বড় বাস কোম্পানির বড় অংশের সঙ্গে রাজনীতিবিদদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে চাঁদার অর্থনীতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গেও জড়িত। পরিবহন খাতে পুলিশ, মালিক-শ্রমিক, রাজনৈতিক পক্ষের নামে প্রকাশ্যে চাঁদা তোলা হয়। যদি বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ অনানুষ্ঠানিকভাবে আদায় হয়, তবে তা পরিবহন খাতের ব্যয় কাঠামোর অংশ হয়ে যায়। আর ব্যয় বাড়লে ভাড়া বাড়ে, এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম।

বিদেশে কী হয়

বিশ্বের বহু দেশে সড়ক ব্যবহার বা টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার জন্য ফি নেওয়া হয়। তবে সেই ফি আইন দ্বারা নির্ধারিত। সরকার বা অনুমোদিত সংস্থা আদায় করে। টোলপ্লাজা, সিটি বাস টার্মিনাল ফি বা লাইসেন্স ফি- সবই নিরীক্ষা ও জবাবদিহির আওতায় থাকে। ভারত, মালয়েশিয়া বা ইউরোপের দেশগুলোতে টোল আদায় হয় সরকারি নীতিমালার ভিত্তিতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। রাজনৈতিক বা শ্রমিক সংগঠন সরাসরি সড়কে দাঁড়িয়ে আলাদা করে অর্থ আদায় করে না।অর্থাৎ, বাংলাদেশে সংগঠনভিত্তিক অনানুষ্ঠানিক চাঁদা আদায়ের চর্চা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রাতিষ্ঠানিক নয়।

কল্যাণের নামে অকল্যাণ

মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো দাবি করে, চাঁদার অর্থ সদস্যদের কল্যাণে ব্যয় হয়। কিন্তু এই তহবিলের নিরীক্ষা বা স্বচ্ছ হিসাব খুব কমই জনসমক্ষে আসে। করোনা মহামারির সময় বহু পরিবহন শ্রমিক আয়হীন হয়ে পড়লেও বড় পরিসরে সংগঠনের সহায়তার নজির সীমিত ছিল।বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমিকদের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত হয় নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট বেতন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতের মাধ্যমে। অনানুষ্ঠানিক চাঁদা তুলে কল্যাণের দাবি টেকসই কাঠামো তৈরি করে না। বরং এটি অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন অনুসারে নিয়োগপত্র ও মাসিক বেতন পাওয়া শ্রমিকের অধিকার। এটা নিশ্চিত করা গেলেই কল্যাণ হয়। চাঁদা তুলে কল্যাণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। কল্যাণের নামে যে চাঁদা তোলা হয়, এর কোনো নিরীক্ষা হয় না। ফলে কীভাবে এবং কারা খরচ করে, তা কেউ জানে না।

বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের

বাসমালিকের পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে যদি অনানুষ্ঠানিক চাঁদা যুক্ত হয়, তবে সেই ব্যয় ভাড়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে যাত্রী সরাসরি না দিলেও পরোক্ষভাবে দেয়।একজন নিম্নআয়ের শ্রমিক, শিক্ষার্থী বা ছোট ব্যবসায়ী প্রতিদিন যাতায়াতে যে ভাড়া দেয়, তার মধ্যেই এই ‘ছায়া খরচ’ যোগ হয়। সুতরাং চাঁদা কেবল মালিক-শ্রমিক সংগঠনের বিষয় নয়; এটি জীবনযাত্রার ব্যয়ের অংশ।

https://sangbad.net.bd/images/2026/February/20Feb26/news/%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%89%E0%A6%B2.JPG

নতুন সরকারের অগ্রাধিকার

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, নতুন সরকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেবে। প্রশ্ন হলো, চাঁদাবাজি বন্ধ ছাড়া কি শৃঙ্খলা সম্ভব? আইন, আদালতের নির্দেশ ও গবেষণার তথ্য- সবই বলছে, সড়কে অননুমোদিত অর্থ আদায় কাঠামোগত সমস্যা। এটি বন্ধ করতে হলে আইনি প্রয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সড়কে পরিবহনের চাঁদা যে জনগণের পকেট থেকেই আসে, তা অস্বীকার করার সুযোগ কম। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনে।

‘অপরাধ ও দুর্নীতি’ : আরও খবর

» পুলিশে গণতান্ত্রিক সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে জোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সম্প্রতি