image

ট্রাইব্যুনালে ‘বাণিজ্য’ ও ‘রাজসাক্ষী নাটকের’ অভিযোগ, তাজুল বললেন ‘বিদ্বেষপ্রসূত’

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি

*চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে তাজুল সিন্ডিকেট: প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ

*‘সর্বতোভাবে মিথ্যা’ ও ‘ভিত্তিহীন’, দাবি তাজুলের

*‘দুর্নীতি ও অনিয়মের’ অভিযোগের তীর আইনজীবী শিশির মনির ও প্রসিকিউটর তামিমের দিকেও

*এসব অভিযোগ তদন্ত করে দেখতে হবে: নতুন চিফ প্রসিকিউটর

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ‘বাণিজ্য’ ও ‘রাজসাক্ষী নাটকের’ অভিযোগ তুলেছেন প্রসিকিউশন টিমের সদস্য বিএম সুলতান মাহমুদ। তাজুল ইসলাম চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে ‘টাকা কামানোর হাতিয়ার’ হিসেবে ‘ব্যবহার করেছেন’ বলেও অভিযোগ সুলতান মাহমুদের।

তবে এসব অভিযোগকে ‘সর্বতোভাবে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন তাজুল। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে সামান্য তথ্য-প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না বলে দাবি করেছেন তিনি।

গত সোমবার সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী বানানো নিয়ে ‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ শিরোনামে নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেন প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ। ওই পোস্টে ‘প্রসিকিউশন টিমের একটি প্রভাবশালী অংশ গোপন সমঝোতা বা ‘বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে’ বলে অভিযোগ করা হয়। তার ওই পোস্টের বক্তব্যের সঙ্গে সমর্থন জানিয়ে এবং আরও কিছু তথ্য তুলে ধরে মন্তব্য করেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অন্যতম সদস্য বিএম সুলতান মাহমুদ।

কী অভিযোগ

প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ বলেন, “আমি দীর্ঘদিন প্রসিকিউশন টিমে কাজ করছি। সেই কাজের সুবাদেই বলছি, শুধু আইজিপি মামুন নয়, আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলায় টাকার বিনিময়ে আফজালকেও রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। তিন চারজনের একটি সিন্ডিকেট শুরু থেকেই এই চক্রে জড়িত। ধানমন্ডি তদন্ত সংস্থায় বসে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির সিন্ডিকেট সাবেক আইজি মামুনকে রাজসাক্ষীর নাটক বানায়। সাবেক আইজিপি মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ধানমন্ডি তদন্ত সংস্থায় আনলে সেখানে শিশির মনির উপস্থিত থাকতো। তারা দাগি খুনি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছে নিরাপদে। চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে এই তাজুল সিন্ডিকেট।”

সুলতান মাহমুদ আরও বলেন, “গত বছর নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি আফজালের বউ সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের রুমে প্রবেশ করে। বিষয়টি আমরা দেখার পরে সঙ্গে সঙ্গে তাজুল ইসলামের রুমে গিয়ে তাকে জানাই। এই ঘটনায় কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বরং উল্টো আমাদের বকাঝকা করে। তামিম তখন সবার সামনে স্বীকার করেছিলো যে, আফজালের বউ তার রুমে এসেছিল। চিফ প্রসিকিউটর শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন আসামির বউ কেন তার রুমে গিয়েছিল। শুধু এই জিজ্ঞাসা করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে সেই আফজালকে রাজসাক্ষী করা হলো। চূড়ান্ত বিচারে তাকে খালাস দেয়া হলো।”

তিনি বলেন, “চানখারপুলের মামলায় এসআই আশরাফুল গুলি করার নির্দেশনা দিচ্ছে এরকম ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পরও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। সেই ভিডিও আমার কাছে আছে। রংপুরের আবু সাঈদের মামলায় এসি ইমরানকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এই ইমরানের নাম কয়েকজন সাক্ষীরা আদালতে এসে বলেছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের শেখ হাসিনার মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতো। কিন্তু সেটা না করে মামলা প্রতি ২-৪ জনকে আসামি করে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে জনগণকে ধোকা দেয়া হয়েছে। এগুলো চব্বিশের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি।”

কী বললেন তাজুল

যদিও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ দাবি করে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, “গতকাল (সোমবার) ও আজ (মঙ্গলবার) কিছু গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটরের বরাতে আমার ব্যাপারে কিছু বিদ্বেষপ্রসূত ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এসব বক্তব্য জঘন্য মিথ্যাচার, তথ্য-প্রমাণবিহীন।”

তাজুল ইসলামের দাবি, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দুরভিসন্ধি থেকে এসব করা হয়েছে। এসব বিদ্বেষপ্রসূত ও অভিযোগগুলো সর্বতোভাবে মিথ্যা। আমি চ্যালেঞ্জ করছি- আমার ব্যাপারে আনীত এসব অভিযোগের স্বপক্ষে সামান্য তথ্য-প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আমি এবং প্রসিকিউশন টিমের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বচ্ছ ও আইনসম্মত।”

তিনি দাবি করেন, “পতিত স্বৈরাচার ও গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া থেকে দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে সংগঠিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে একটি মহল। যেন কোনোভাবে এ বিচার আর অগ্রসর না হতে পারে।”

বিদায়ী এই চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “দায়িত্বকালে কেউ আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাননি। কিন্তু বিদায় নেওয়ার পর গণহত্যাকারীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এসব অভিযোগ তুলে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বিশেষ একটি মহল। অতএব সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ধরনের মিথ্যাচার ও ঘৃণ্য অপতৎপরতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।”

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম দীর্ঘ দিন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি এক সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের আইনজীবী ছিলেন।

যা বললেন নতুন চিফ প্রসিকিউটর

তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তামিমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি ও অনিয়োমের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গতকাল নিজ কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে নবনিযুক্ত চীফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “এসব অভিযোগ আমাকে তদন্ত করে দেখতে হবে, আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, প্রসিকিউশনের কেউ কোনো ধরনের করাপশনে জড়িত থাকলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা প্রমাণ করে দেবো যে, এ ট্রাইব্যুনাল সম্পূর্ণরূপে করাপশন ফ্রি, এখানে আন্তর্জাতিক মানের বিচার হচ্ছে। এখানে বিচারের বাইরে অন্য কোনো আলোচনা আমরা প্রশ্রয় দেবো না।”

গত সোমবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক গেজেটের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা আমিনুল ইসলামকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই আদেশে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পাওয়া তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়। এদিন বিকালেই নতুন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন তাজুল ইসলাম।

‘অপরাধ ও দুর্নীতি’ : আরও খবর

সম্প্রতি