image

ট্রাইব্যুনাল

এবার সুলতানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরাতে ‘চিঠি দিয়েছিলেন’ তাজুল

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি

# প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ কর্তৃপক্ষের ‘অনুমতি ছাড়া’ ট্রাইব্যুনালের গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত গোপনীয় তথ্যাদি ‘বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করছেন’: চিঠিতে তাজুল

# সুপ্রিমকোর্টের নিরাপত্তা প্রহরীকে মারধরের অভিযোগ, ঘটনা সত্য বলে দাবি গার্ড মাঈন উদ্দিনের

# স্ত্রীকে ‘মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের’ অভিযোগ, মিথ্যা ও গভীর ষড়যন্ত্র দাবি সুলতান মাহমুদের

# তাজুলের চিঠিতে গানম্যানের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, গানম্যানদের কাছে জিজ্ঞেস করলেই সত্যতা পাওয়া যাবে বলে দাবি সুলতান মাহমুদের

# আইন উপদেষ্টা তাদের ঘনিষ্ঠ লোক থাকা সত্ত্বেও আমার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়নি প্রশ্ন সুলতানের

# সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করায় তারা এখন এই বিষয়গুলোর সামনে নিয়ে আসছে: সুলতান

‘বিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি ভঙ্গ’ করা, সুপ্রিম কোর্টের নিরাপত্তা প্রহরীকে ‘মারধর’ করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদকে ‘অপসারণের অনুরোধ করেছিলেন’ বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। স্ত্রীকে ‘মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের’ অভিযোগও তোলা হয়েছিলো। আর এসব অভিযোগে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে তিনি গত ১১ জানুয়ারি চিঠি পাঠান। তাজুলের বিরুদ্ধে সুলতান বিভিন্ন অভিযোগ তোলার পর ওই চিঠির বিষয়টি বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) নিশ্চিত করেন সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর।

নির্যাতনের বিষয়ে সুলতানের স্ত্রী গত বছরের ১৮ নভেম্বর সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের কাছে অভিযোগ ‘দাখিল করেছিলেন’ বলে দাবি করেছেন। হাইকোর্টের নিরাপত্তা প্রহরীকে মারধরের যে অভিযোগ চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন তাজুল, তা ‘সত্য‘ বলে এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেছেন গার্ড মাঈন উদ্দিন। যদিও এই মারধরের অভিযোগকে ‘আক্রোশবশত’ বলে দাবি করেন সুলতান।

স্ত্রী নির্যাতনের ঘটনা ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ দাবি করে সুলতানের চ্যালেঞ্জ ‘পারলে দুর্নীতির অভিযোগ আনুক’। সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুলের বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতির’ অভিযোগ তোলায় তারা এখন ‘এই বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসছে’ বলেও অভিযোগ করেন আন্তর্জাতিক অপরাপধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সুলতান।

কী আছে তাজুলের চিঠিতে

আইন উপদেষ্টাকে দেয়া সেই চিঠিতে তাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, “প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত ট্রাইব্যুনালের গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত গোপনীয় তথ্যাদি বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করছেন” বলে ‘তিনি জেনেছেন’। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “সুলতান মাহমুদের কর্মকাণ্ড ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং আদালতের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ এ প্রতিবেদককে বলেন, “কোন্ গোপনীয় নথি এটা পারলে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে পারত কিন্তু সেটা তারা করেনি”। তার দাবি “গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এগুলো তারা আগেই প্রস্তুত করে রেখেছিল যাতে সময় মতো আমার বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা তাদের ঘনিষ্ঠ লোক থাকা সত্ত্বেও তাহলে আমার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়নি? ইচ্ছা করলে তো তারা আমাকে সঙ্গে সঙ্গে অপসারণ করতে পারত।”

তাজুল ইসলাম তার অভিযোগে আরও বলেন, “প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ হাইকোর্টের লিফটে যাতায়াতের সময় নিরাপত্তা প্রহরী মো. মাঈন উদ্দিনকে তুচ্ছ ঘটনাক্রমে উত্তেজিত হয়ে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। জোর করে তাকে গানম্যান দিয়ে ধরে বার অ্যাসোসিয়েশনের অফিসকক্ষে নিয়ে যান। তারপর মাঈন উদ্দিনকে প্রচণ্ড মারধর করেন। এতে তার চোয়াল, হাত, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জখম হয়। গুলি করে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় তাকে। সুলতান মাহমুদের এমন কর্মকাণ্ডে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম ও ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।”

প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ গানম্যানকে দিয়ে তুচ্ছ কারণে যত্রতত্র যাকে-তাকে গুলি করার নির্দেশ দেন বলেও অভিযোগ করেন তাজুল ইসলাম। চিঠিতে তিনি আরও বলেন, “এই অভিযোগে এ পর্যন্ত চারজন গানম্যান স্বেচ্ছায় সুলতান মাহমুদের সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানান। এমন অবস্থায় তাৎক্ষণিক গানম্যান পরিবর্তন করে দিতে হয়।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের গার্ড মো. মাঈন উদ্দিন এই প্রতিবেদককে মারধরের ঘটনা ও সাবেক চিফ প্রসিকিউরের কাছে দেওয়া অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেন। অভিযোগ ছাড়া আর কোনো আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে ওই গার্ড বলেন, “না, আইনি ব্যবস্থা নেই নাই। অভিযোগ দিছি। ওনার বিরুদ্ধে আর কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারি নাই।”

গত বছরের ২৮ অক্টোবর সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বরাবর দেওয়া অভিযোগে মাঈন উদ্দিন জানান, ‘গত ২৬/১০/২০২৫ খ্রি. তারিখে বিকাল আনুমানিক ৪.১৫ ঘটিকায় এনেক্স ভবনে লিফট নিয়ে নিচে নেমে লিফট থেকে বের হওয়ার সময় অসাবধানতা বশত আমার পা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জনাব বি.এম সুলতান মাহমুদ মহোদয়ের পায়ের সাথে ঘঁষা লাগে। ফলে আমি তৎক্ষণাৎ তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। অনুতাপ প্রকাশ করি। আমি তৎক্ষণাৎ আমার পরিচয় বলি। আমি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগে ‘নিরাপত্তা প্রহরী (দারোয়ান)’ পদে কর্মরত আছি। এটা বলার পরই তিনি শান্ত না হয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া জানান। আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।” তাকে ‘জোরপূর্বক গানম্যান দিয়ে ধরিয়ে’ বার অ্যাসোসিয়েশনের অফিসে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে ‘প্রচণ্ড মারধর’ করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন তিনি।

মাঈন উদ্দিন অভিযোগপত্রে লিখেছেন, “আমাকে গুলি করে মেরে ফেলার জন্য গানম্যানকে নির্দেশ দেন। আমি অনেক অনুনয় বিনয় করলেও তার প্রচণ্ড ক্ষোভ থেকে রেহাই পাইনি। তার মারধরের ফলে আমার চোয়ালে, হাতে, মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ফোলা জখম হয়। ”

নিরাপত্ত প্রহরীকে মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে সুলতান মাহমুদ জানান, “মাইনুদ্দিন (গার্ড) ছেলেটা আমার সঙ্গে বেয়াদবি করেছিল বিধায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন তার বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। আক্রোশবশত সে আমার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ দিয়েছে যেটা আমি এখনই দেখলাম। ”

অপসারণের অনুরোধ জানিয়ে সেই চিঠিতে তাজুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, “প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ বিভিন্ন সময়ে মামলার সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের বাসায় ডেকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক পরামর্শ, মিথ্যা তথ্য ও উসকানি প্রদানের মাধ্যমে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।”

স্ত্রীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সম্পর্কে জানতে চাইলে, সুলতান এসব অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে দাবি করেন। এই প্রসিকিউটর বলেন, “এরা এগুলো অনেক গভীর ষড়যন্ত্র করে আগে থেকে প্রস্তুত করে রেখেছিল।”

তাজুলের চিঠিতে উল্লেখ করা গ্যানম্যানদের নির্যাতনের ও গুলি করতে নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে সুলতান মাহমুদ বলেন, “আমার গানম্যানদের কাছে জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পাওয়া যাবে- আমি তাদের সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করি কিনা বা তাদের গুলি করার নির্দেশ দিয়েছি কিনা।”

তাজুল ইসলাম তার চিঠির সঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বরাবর নিরাপত্তা প্রহরী ‘মাঈন উদ্দিনের দেওয়া অভিযোগ’ এবং চিফ প্রসিকিউটর বরাবর ‘হাতে লেখা সুলতান মাহমুদের স্ত্রীর একটি চিঠিও’ যুক্ত করে দেন। তবে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ বলেন, “তৎকালীন আইন উপদেষ্টা বা প্রসিকিউশন অফিস আমাকে এ ব্যাপারে কোনো দিন কোনো প্রশ্ন করেনি। এখন এই বিষয়গুলো উত্থাপন করছে। তখন আমার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিল না তাহলে? মাইনুদ্দিন ছেলেটা আমার সঙ্গে বেয়াদবি করেছিল বিধায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন তার বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। আক্রোশবশত সে আমার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ দিয়েছে যেটা আমি এখনই দেখলাম। আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছি পারলে আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনুক। সেটা না করে তারা পুরাতন বিষয়ে সামনে নিয়ে আসছে।”

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্বে থাকা মুহাম্মদ তাজুল ইসলামের নিয়োগ গত সোমবার বাতিল করেছে বিএনপির সরকার। সেদিনই সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ আনেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। এ বিষয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেড় মাস আগে সুলতান মাহমুদকে অপসারণের বিষয়ে তৎকালীন আইন উপদেষ্টাকে তাজুল ইসলামের চিঠি দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

‘অপরাধ ও দুর্নীতি’ : আরও খবর

সম্প্রতি