ট্যুরিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার
কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত ঘিরে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন প্রভাবশালী দখলদাররা। গভীর রাতে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দোকান বসিয়ে তারা ভাড়া দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ অনুমোদন ছাড়াই যত্রতত্র বসার ব্যবস্থা করে ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া নিচ্ছেন।
এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে সৈকত খাদকদের রোষাণলে পড়েছে পুলিশ। পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এরপরও সৈকত রক্ষায় কঠোর অবস্থানে আছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। ট্যুরিস্ট পুলিশের ঢাকাস্থ সদর দপ্তর ও কক্সবাজার জেলা রিজিয়ন অফিস থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে সুগন্ধা সৈকতে ৩০ থেকে ৩২টি অবৈধ দোকান বসায় সৈকত খাদকরা। এসব দোকান ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল তারা। এমন খবর পেয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয় থেকে কক্সবাজার রিজিয়ন অফিস পর্যন্ত তা জানাজানি হয়। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ওই দিন ভোর রাতে ট্যুরিস্ট পুলিশ অবৈধ দোকানগুলো উচ্ছেদ করে।
এছাড়াও আরও বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে পুলিশ। এসব অবৈধ দোকান বসাতে স্থানীয় কিছু সাংবাদিক নামধারী দখলদার রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের রিজিয়ন প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ জানান, সমুদ্র সৈকতের জায়গা অবৈধভাবে দখল, চাঁদাবাজি ও কথিত কিছু ব্যক্তির অবৈধভাবে দোকান স্থাপনের বিরুদ্ধে ট্যুরিস্ট পুলিশ ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। এই অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এখন ট্যুরিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে নানা ভাবে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
এই পুলিশ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, নির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে তা তুলে ধরা হোক। তার মতে, সৈকত এলাকায় স্পা, কটেজ ও অবৈধ স্থাপনা সংক্রান্ত একাধিক অনিয়মের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চাঁদাবাজি ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ট্যুরিস্ট পুলিশ বদ্ধপরিকর। দখলদাররা আমাদের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সৈকত এলাকায় অনুমোদিত কিছু কিছু দোকান আছে। কিন্তু সম্প্রতি প্রভাবশালীরা যত্রতত্র অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে সৈকতের পরিবেশ নষ্ট করছে। তারা সুগন্ধা বীচ, কলাতলী, লাবণী, ইনানী, পাটুয়ারটেক, হিমছড়ি, পাথরের রানী বিচসহ বিভিন্ন স্থানে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করছে। বাধা দিলে তারা প্রভাব বিস্তার করছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের উল্টো হুমকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকে দলীয় প্রভাব বিস্তার করছেন। নতুন করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সৈকতের পরিবেশ নষ্ট করে দোকান বসানো হচ্ছে।
সংবাদ প্রতিবেদকের কাছে ১০টি ছবি রয়েছে। এসব ছবিতে সমুদ্র সৈকত জুড়ে দোকান দেখা গেছে। দুই পাশে দোকান, মাঝখানে সরু জায়গা দিয়ে সৈকতে যেতে হচ্ছে। সমুদ্রের ঢেউ পর্যন্ত এখন দোকান দেখা যাচ্ছে, যা আগে ছিল না। আগে ঝিনুক মার্কেটসহ অনুমোদিত কিছু দোকান ছিল। এখন সেখানে অবৈধ দোকান বসানোর উৎসব চলছে। প্রতিবাদ করলে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সৈকতের কিছু অংশে অবৈধ দোকান বসিয়ে চাঁদা আদায় করতো। অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির কারণে পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এতে পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সমুদ্র সৈকত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা। দখলমুক্ত হলে পর্যটক ও স্থানীয়রা উপকৃত হবেন। পর্যটন জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত বলে তারা মন্তব্য করেন।
সৈকতে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার সময় অনেকেই সৈকতে গিয়ে হাঁটাচলা করেন। কিন্তু সৈকতের কাছাকাছি অনুমোদিত বসার জন্য নিয়মমতো কিটকট থাকলেও প্রভাবশালীরা গভীর রাতে প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই আরও কিটকট বসিয়ে তা ভাড়া দিয়েছে। সম্প্রতি ট্যুরিস্ট পুলিশ ১৫টি কিটকট জব্দ করেছে।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সন্ধ্যায় সমুদ্র সৈকত থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা মুঠোফোনে জানান, নতুন করে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় নেতা ও কথিত সাংবাদিকরা পরস্পর যোগসাজশে অবৈধ দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করছে।
এর আগেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একটি চক্র প্রভাব খাটিয়ে সুগন্ধা বিচ থেকে ইনানী, পাথরের রানী বিচ পর্যন্ত দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করতো। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন করে আরেক দখলদার গ্রুপ এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করছেন।
মঙ্গলবার বিকেলে ট্যুরিস্ট পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, রমজানের ঈদের ছুটিতে সমুদ্র সৈকতে ২ লাখের বেশি পর্যটক যাবেন। সেখানে চারশর বেশি হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। তাদের নিরাপত্তায় তিন স্তরে বাড়তি ফোর্স মোতায়েন করা হবে। অতিরিক্ত ফোর্স চেয়ে ঢাকায় চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এ সম্পর্কে ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মাইনুল হাসান বলেন, বিচ পরিচালনার একটি কমিটিও আছে। তারা বিষয়টি দেখবেন। আমরা তাদের সহায়তা করব।
বিচ কমিটি ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ট্যুরিস্ট পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সহযোগিতা করবে। তাহলে বিচ এলাকার পরিবেশ আরও উন্নত হবে। এতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে।