ক্যালেন্ডারের পাতায় বসন্ত ঠিকই আসে। ফাল্গুন-চৈত্রের দিনগুলো রঙ মেখে হাজির হয় শহর আর গ্রামে। শিমুল-পাতাঝরা পথের ধারে হালকা হলুদ রোদ, কচি পাতার সবুজ আর কৃষ্ণচূড়ার আগুনরঙা আভা- সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন করে সাজে। কিন্তু কোথায় যেন একটুখানি শূন্যতা থেকে যায়। বাতাসে আছে উষ্ণতার স্পর্শ, আছে ফুলের রঙ, তবু নেই সেই চেনা ভ্রমরের গুঞ্জন। নেই আগের মতো মৌ মৌ ঘ্রাণে ভরা সকাল।
বসন্ত একসময় শুধু ঋতু ছিল না, ছিল শব্দেরও উৎসব। গাছের ডালে ডালে মৌমাছির দল ভনভন করত, সরষেখেতে গুনগুন শব্দে ভরে উঠত গ্রামবাংলা। ফুল ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হতো এক অদৃশ্য সুরের আসর। এখন সেই সুর যেন অনেকটাই ম্লান। জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা আর কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার ভ্রমর ও মৌমাছির সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, পরাগায়নের জন্য এদের ভূমিকা অপরিসীম- তবু তারাই আজ বিপন্ন।
বসন্তের আরেকটি পরিচয় ছিল তার গন্ধ। বকুল, শিউলি, নাগেশ্বর বা রাতরানির মতো ফুলের ঘ্রাণ ভেসে বেড়াত সন্ধ্যার বাতাসে। এখন সেই ঘ্রাণ যেন দ্রুত মিলিয়ে যায় ধোঁয়া আর ধুলোর মধ্যে। শহরের ব্যস্ত সড়কে গাড়ির কালো ধোঁয়া, কারখানার দূষণ আর নির্মাণকাজের ধুলিকণা মিশে বাতাসকে ভারী করে তোলে। ফুল ফুটলেও তাদের সুবাস ছড়িয়ে পড়ার আগেই যেন স্তব্ধ হয়ে যায়।
বায়ুদূষণ শুধু মানুষের শ্বাসকষ্ট বাড়ায় না। ফুলের জীবনচক্রেও প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত তাপ আর অনিয়মিত বৃষ্টি অনেক গাছের ফুল ফোটার সময় বদলে দিচ্ছে। কিছু ফুল আগেভাগে ফোটে, কিছু আবার ঠিকমতো ফোটেই না। প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হলে বসন্তের চিরচেনা চিত্রটাও বদলে যায়।
তবু বসন্ত থেমে থাকে না। কৃষ্ণচূড়া আগুন ধরায় আকাশে, শিমুল লাল পাপড়ি ছড়িয়ে দেয় পথজুড়ে, সরষে খেত সোনালি রোদে ঝলমল করে। তরুণ-তরুণীরা হলুদ শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে রঙ মেলে উৎসবে যায়। গান বাজে- “এসো হে বসন্ত”-কিন্তু সেই গানেও যেন লুকিয়ে থাকে একটুখানি আক্ষেপ।
প্রকৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সে এখনও বেঁচে আছে। এখনও রঙ ছড়াতে জানে। কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের। মৌমাছি আর ভ্রমর শুধু গুনগুন শব্দের অংশ নয়, তারা কৃষি উৎপাদন আর খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাদের হারানো মানে ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলা।
শহরের ছাদে যদি ছোট্ট বাগান গড়ে ওঠে, রাস্তার ধারে যদি গাছ লাগানো হয়, কীটনাশকের ব্যবহার যদি নিয়ন্ত্রিত হয়- তবে হয়তো আবার ভরে উঠবে বসন্তের আকাশ ভ্রমরের ডানার শব্দে। হয়তো আবার বাতাসে ভেসে আসবে ঘন ফুলের গন্ধ।
আজকের বসন্ত তাই এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। রঙ আছে, ফুল আছে, উৎসব আছে- তবু কোথাও যেন এক নীরবতা। দূষিত বাতাসে আসে নীরব বসন্ত, ফোটে নানা ফুল, উদাস হয় মন। এই উদাসীনতা শুধু আবেগ নয়, এক সতর্কবার্তাও। প্রকৃতির সুর যেন পুরোপুরি থেমে না যায়- সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
অর্থ-বাণিজ্য: বিদেশি ঋণ পাওয়ার চেয়ে পরিশোধই বেশি
আন্তর্জাতিক: পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতে কী বলছে ভারত