image

শিক্ষা আইন-২০২৬ এর খসড়া: ৫ বছরের মধ্যে কোচিং বাণিজ্য ও সহায়ক বই বন্ধ করার উদ্যোগ

রাজধানীর স্কুলগুলোতে ফের সহায়ক বই কেনার তাগাদা

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

কোচিং বাণিজ্য ও সহায়ক বই তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বন্ধ করতে চাচ্ছে সরকার। যদিও নতুন শিক্ষাক্রমের কারণে গত দুই-তিন বছর সহায়ক বইয়ের চাহিদা এমনিতেই কমছিল। চলতি শিক্ষাবর্ষে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে অতিরিক্ত বইয়ের তালিকা শিক্ষার্থীদের ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানের সহায়ক বই (নোট/গাইড) কিনতে বলা হচ্ছে।

এই অবস্থায় আইন প্রবর্তনের তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কোচিং সেন্টার ও সহায়ক বই প্রকাশ ‘স্থায়ীভাবে’ বন্ধ করার বিধান রেখে ‘শিক্ষা আইন-২০২৬’ এর খসড়া প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

গত ১ ফেব্রুয়ারি রাতে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এ খসড়া আইনের ওপর ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টার মধ্যে ই-মেইলের মাধ্যমে মতামত জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।

শিক্ষা উপদেষ্টা সিআর আবরার গত ২০ জানুয়ারি ঢাকায় ‘জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৬’-এর পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘শিশু ও তরুণ শিক্ষার্থীদের কাঁধে আমরা অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি। মাসে মাসে তাদের লিখিত পরীক্ষার মুখে ফেলে দিচ্ছি। এতে তাদের অন্যান্য গুণাবলী বিকাশের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন সময় এসেছে এই দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করার।’

একাধিক অভিভাবক জানিয়েছেন, গত দু’বছর রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী মডেল হাইস্কুলে সরকার অনুমোদিত পাঠ্যবই ছাড়া কোনো সহায়ক বই পড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়নি। কিন্তু এবার একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সহায়ক বই কিনতে শিক্ষার্থীদের তালিকা ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। সে অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত দেড় হাজার টাকার বই কিনতে হচ্ছে।

২০২৪ সালে তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ও এনসিটিবির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম রিয়াজুল হাসানের ‘কঠোর’ পদক্ষেপে ছাপাখানাগুলো সহায়ক বই ছাপাতে পারেনি। এমনকি ছাপাখানাগুলো পাঠ্যবই ছাপার আগে সৃজনশীল ও শিশুতোষ বইও ছাপাতে পারেনি।

অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান সংবাদকে বলেন, ‘প্রকাশকদের সময় দিয়ে সহায়ক বই বা নোট-গাইড বন্ধ করা যাবে না। আইন করে এগুলো বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ও সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার।’

তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর এনসিটিবির নির্দেশনায় বলা হয়, পাঠ্যবই ছাপার আগে সৃজনশীল বই এমনকি শিশুতোষ গল্প-উপন্যাসও ছাপা যাবে না। তাহলে পাঠ্যবইয়ের ঠিকাদারদের প্রেস সিলগালা করার পাশাপাশি কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। কিন্তু এবার শুনলাম পাঠ্যবই ছাপার ঠিকাদারদের প্রেসে পাঠ্যবই না ছেপে দেদার নোট-গাইড বই ছাপা হচ্ছে।

সরকার ১৯৮০ সালে আইন করে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত

পাঠ্যপুস্তকের নোট বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশনা, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। উচ্চ আদালতের এক রায়েও গাইড ও নোট বই মুদ্রণ ও বাজারজাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এছাড়া ২০০৮ সালের এক নির্বাহী আদেশেও নোট ও গাইড নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ আদালত নোট ও গাইড বই বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে এক রায় দেয়।

খসড়া শিক্ষা আইন

সদ্য প্রকাশিত আইনের খসড়ার ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার কোচিং সেন্টার, সহায়ক পুস্তক (নোট বই বা গাইড বই যে নামেই অভিহিত হোক) প্রকাশ ও প্রাইভেট টিউশনি নিয়ন্ত্রণকল্পে বিধিমালা প্রণয়ন করবে। ধারাবাহিকভাবে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে এই আইন প্রবর্তনের তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কোচিং সেন্টার স্থাপন, সহায়ক পুস্তক প্রকাশ ও প্রাইভেট টিউশনের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধের কার্যক্রম গ্রহণ করবে।

১৪ পৃষ্ঠার এই খসড়ায় ১১টি অধ্যায়ে ৫৫টি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে প্রকাশিত এই খসড়ায় মতামত দেয়ার সময় দেয়া হয়েছে মাত্র সাত দিন।

খসড়ার ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো এলাকা বা অঞ্চলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রয়োজনীতা নেই বলে সরকারের কাছে প্রতীয়মান হলে সরকার তা পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা অন্যত্র স্থানান্তর করতে পারবে। সরকার কর্তৃক অনুমতিপ্রাপ্ত নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হবে। বিদেশি শিক্ষাক্রমে পরিচালিত (ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল), কিন্ডারগার্টেন, মাদরাসা স্থাপন ও পরিচালনা অথবা বিদেশি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে শাখা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই শর্ত প্রযোজ্য হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে এবং ওই তহবিল কোনো অবস্থাতেই সংস্থা, ট্রাস্ট বা অন্যত্র স্থানান্তর করা যাবে না। বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পরিচালিত স্কুল মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

খসড়ার ২৪ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি ভার্সনসহ বিদেশি শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পরিচালিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেতন, টিউশন ও অন্যান্য ফি আদায়ের বিষয়সমূহ সময় সরকার কর্তৃক প্রণীত নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত হবে।

উচ্চশিক্ষার মূল্যায়নের ব্যাপারে খসড়ার ৩১ ধারায় বলা হয়েছে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সব শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতিতে হবে।

এছাড়াও পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, সৎ সাহস ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ, সামাজিক ও ধর্মীয় চেতনা এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে খসড়া আইনে।

এতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকদের জন্য নিজ নিজ ক্ষেত্রে গবেষণা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি উদ্যোগে কেন্দ্রীয় গবেষণাগার ও জাতীয় গবেষণা পরিষদ গঠনের কথাও বলা হয়েছে খসড়ায়।

খসড়ায় বলা হয়েছে, শিক্ষা আইন-২০২৬ বাস্তবায়নের জন্য সরকার জাতীয় শিক্ষা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করবে। এই একাডেমি শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষা গবেষণা, উদ্ভাবন, নীতিগত সহায়তা প্রদান, পাঠ্যক্রম মূল্যায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণে সরকারকে পরামর্শ দেবে।

শারীরিক শাস্তি

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে কোনো ধরনের শারীরিক শাস্তি দিতে পারবেন না। শিক্ষার্থীদের মানসিক নিপীড়নও করা যাবে না। এসব বিধান লঙ্ঘন করলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেয়া যাবে। তবে শিক্ষার্থীর মঙ্গল বিবেচনায় ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বার্থে শিক্ষার্থীকে যৌক্তিক ও মানবিক শৃঙ্খলামূলক অনুশাসন দিতে পারবেন শিক্ষকরা। সেক্ষেত্রে বিষয়টি অভিভাবককে জানাতে হবে।

দেশে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা হয়। এরপরও প্রায়ই শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়। সেই আলোকে ২০১১ সালে শিক্ষা আইন করার উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়। এটি মন্ত্রিসভার কয়েক দফা বৈঠকে উপস্থাপন হলেও আলোর মুখ দেখেনি। অভিযোগ রয়েছে, নোট-গাইড বই ও কোচিং ব্যবসায়ীদের নানা তৎপরতায় আইনটি আলোর মুখ দেখেনি। সর্বশেষ ২০১৮ সালে মন্ত্রিসভা শিক্ষাসংক্রান্ত সব আইন সমন্বয় করে নতুন করে শিক্ষা আইনের খসড়া তৈরির নির্দেশনা দেয়।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা ও আইন অনুবিভাগ) জহিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সবার মতামত সংগ্রহের পর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করা হবে।

‘শিক্ষা’ : আরও খবর

সম্প্রতি