ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা, প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটকের ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প

শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ ডেস্ক

https://sangbad.net.bd/images/2026/January/03Jan26/news/sangbad_bangla_1767442043.jpg

ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পরে তাকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার (৩ জানুয়ারি) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ’-এ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ দাবি করেন।

মাদুরোকে তুলে নেয়ার পর মাদক সন্ত্রাসের দায়ে তার বিচার করবে বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল এ তথ্য জানিয়েছেন।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কারাকাসের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত প্রধান সামরিক স্থাপনা ফোর্ট তিউনার কাছাকাছি এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ওই এলাকায় হামলার মুহূর্ত ধরা পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রাথমিক তথ্যে আরও দাবি করা হয়েছে, জেনারালিসিমো ফ্রান্সিসকো দে মিরান্ডা বিমান ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার সময় কারাকাসের আকাশে মার্কিন সিএইচ-৪৭ চিনুক হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গেছে। প্রশস্ত অ্যাঙ্গেলের কিছু ফুটেজে শহরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন বিমান হামলার দৃশ্য রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, আল-জাজিরা

‘ট্রুথ সোশ্যালে করা পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সাফল্যজনকভাবে একটি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে আর দেশটির নেতা, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে, যিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন, আটক করে আকাশ পথে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই অভিযান চালানো হয়েছে।

রয়টার্স লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে পানামায় আক্রমণ করার পর থেকে লাতিন আমেরিকায় এ ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপ আর করেনি। ৩৬ বছর আগের ওই ঘটনায় মার্কিন বাহিনী পানামায় অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন সামরিক নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে পদচ্যুত করে ও তারপর আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়েছিল।

https://sangbad.net.bd/images/2026/January/03Jan26/news/putin-01.jpg

ট্রাম্প মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটকের কথা জানালেও ভেনেজুয়েলা সরকার তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি নিশ্চিত করেনি।

মাদুরো একটি ‘মাদক-রাষ্ট্র’ পরিচালনা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের। তিনি নির্বাচনে কারচুপি করেছেন বলেও অভিযোগ ওয়াশিংটনের।

অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো পাল্টা অভিযোগ করে বলেছিলেন, ওয়াশিংটন তার দেশের জ্বালানি তেলের মজুতের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি তেলের মজুদ আছে ভেনেজুয়েলায়। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট উগো চাভেসের পরবর্তীতে ২০১৩ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন মাদুরো।

মার্কিন কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটক করেছে। ডেল্টা ফোর্স মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট।

এর আগে শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। সিএনএনের সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের প্রভাবে শহরের ভবনগুলো কেঁপে ওঠে এবং বড় একটি অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট আগেই জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র তার দেশের তেল ও খনিজ সম্পদ দখলের চেষ্টা করছে।

https://sangbad.net.bd/images/2026/January/03Jan26/news/vinijuyala.jpg

মার্কিন কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ভেতরে সামরিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। গত সোমবার ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, মাদুরোর ক্ষমতা ছেড়ে দেয়াই হবে ‘বুদ্ধিমানের কাজ’। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে মাদুরোকে দেশ ছেড়ে পালাতে চাপ দিয়ে আসছিলেন।

শনিবার ভোরে দেয়া এক বিবৃতিতে ভেনেজুয়েলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, রাজধানী কারাকাসসহ মিরান্ডা, আরাগুয়া ও লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। ভেনেজুয়েলা সরকার এ হামলাকে ওয়াশিংটনের ‘চরম গুরুতর সামরিক আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করে জরুরি অবস্থা জারি করেছে।

‘মাদক সন্ত্রাসের’ দায়ে মাদুরোর বিচার করবে যুক্তরাষ্ট্র
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিচার করার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বোন্ডি মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে জানিয়েছেন, মাদক সন্ত্রাস ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখার দায়ে তার বিচার করা হবে।

তিনি জানিয়েছেন, নিউইয়র্কের দক্ষিণ ডিস্ট্রিক আদালতে ইতোমধ্যে মাদুরো ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

পাম বোন্ডি এক্সে বলেছেন, ‘মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক সরঞ্জাম (ডিভাইস) রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহারের ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনা হয়েছে।’

বোন্ডি আরও বলেছেন, ‘খুব শিগ্গিরই তাদের যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, মার্কিন আদালতে আমেরিকান কঠোর বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।’ তবে মাদুরোর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

মাদুরোকে ধরে আনায় সামরিক বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সামরিক বাহিনীকে অসংখ্য ধন্যবাদ, যাদের বীরত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত সফল অভিযানের ফলে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এই দুজনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে।’

বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া, নিন্দার ঝড়
ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া অ্যাডেলা ফ্লোরেসকে তুলে নিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন দেশ প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে। স্পেন শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে কারাকাসের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েক নেতা মার্কিন পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন।

রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে নিন্দা করে বলেছে, এই পদক্ষেপের কোনো গ্রহণযোগ্য অজুহাত নেই এবং আদর্শগত শত্রুতা কূটনীতিকে ছাপিয়ে গেছে।

স্পেন উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, তারা গণতান্ত্রিক, আলোচনাভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতায় প্রস্তুত।

জার্মানি জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখেছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কার্যালয় বলেছে, তারা পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছে এবং কারাকাসে অবস্থানরত ইতালীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।

বেলজিয়াম ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করছে বলে শনিবার জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ইরান বলেছে, তারা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার ‘কঠোর নিন্দা’ জানায়-এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখ-তার প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো একে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে অভিহিত করে সতর্ক করেন, এতে মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক তাৎক্ষণিকভাবে করার আহ্বান জানান তিনি।

কিউবা একে ‘সাহসী ভেনেজুয়েলান জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া কামনা করেছে।

ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইয়ভন মিউয়েংকাং বলেন, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইন্দোনেশিয়া। তিনি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে উত্তেজনা প্রশমন ও সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানায় এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলে।’

মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটররা
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ব্রায়ান শ্যাটজ বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় যুদ্ধে যাওয়ার মতো কোনো জাতীয় স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের নেই। সিনেটর রুবেন গালেগো লিখেছেন, এই যুদ্ধ বেআইনি, এক বছরেরও কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘বিশ্ব পুলিশ’ থেকে ‘বিশ্বের বুলি’তে পরিণত হয়েছে।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি