ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ হয়েছে। সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক থেকে নেতানিয়াহু যা চেয়েছিলেন, তা তিনি পেয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। গত সোমবারের বৈঠকের পর নেতানিয়াহুকে ‘বীর’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প। ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য নিজের দেওয়া বিশেষ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী এই পরিকল্পনা ‘শতভাগ সফল’ করেছেন। অথচ গত সপ্তাহেই খবর এসেছিল যে মার্কিন কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্ত। গত অক্টোবরে মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া ২০ দফার যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা কার্যকর করতে নেতানিয়াহু ‘ধীরগতি’ নীতি অবলম্বন করছেন বলে তাঁদের সন্দেহ। হোয়াইট হাউসের ধারণা, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের বিরুদ্ধে নিজের সুবিধামতো সময়ে আবার যুদ্ধ শুরু করার পথ খোলা রাখতেই তিনি এমনটি করছেন।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, গাজায় জীবিত ও মৃত সব জিম্মি বিনিময়, ত্রাণসহায়তা প্রবেশ ও সম্মুখ সমরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর যুদ্ধবিরতি দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার কথা।
এ ধাপে গাজার শাসন পরিচালনায় একটি টেকনোক্র্যাট ‘শান্তি বোর্ড’ গঠন ও উপত্যকাটির নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে আলোচনা করার কথা রয়েছে। অথচ গত সপ্তাহেই খবর এসেছিল যে মার্কিন কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্ত। গত অক্টোবরে মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া ২০ দফার যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা কার্যকর করতে নেতানিয়াহু ‘ধীরগতি’ নীতি অবলম্বন করছেন বলে তাঁদের সন্দেহ। হোয়াইট হাউসের ধারণা, হামাসের বিরুদ্ধে নিজের সুবিধামতো সময়ে আবার যুদ্ধ শুরু করার পথ খোলা রাখতেই তিনি এমনটি করছেন।
তবে নেতানিয়াহু এখনো গাজায় প্রয়োজনীয় ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। তাঁর শর্ত হলো হামাস শেষ জিম্মির মরদেহ ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে যাওয়া সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আগে হামাসকে নিরস্ত্র করার দাবিও তুলেছেন তিনি, যা সোমবারের বৈঠকে ট্রাম্প সমর্থন করেছেন। হামাস অবশ্য আগে থেকেই বলছে, নিরস্ত্রীকরণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ নিয়ে শুধু ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেই আলোচনা হতে পারে। প্রশ্ন উঠছে, নেতানিয়াহু কি তবে ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ এড়াতে চাইছেন? কেন তিনি বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী? এর পেছনে সম্ভাব্য চারটি কারণ তুলে ধরা হলো—
নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট সরকার যেকোনো হিসেবে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর দক্ষিণপন্থী সরকার। গাজা যুদ্ধের সময়জুড়ে এ কট্টরপন্থীরাই তাঁকে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা সামলে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছেন। এখন জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন–গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের মতো কট্টরপন্থী ব্যক্তিরা যুদ্ধবিরতির ঘোরবিরোধী।নেতানিয়াহু যদি গাজায় কোনো বিদেশি সামরিক বাহিনীকে প্রবেশ করতে দেন, তবে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তাঁর কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতার একটি বড় অংশ হারাবেন। আদর্শিকভাবে তিনি চান, পরিস্থিতি ঠিক যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক। তবে সেই সঙ্গে তিনি যেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না হন, সেটিও চান।
এই কট্টরপন্থী ব্যক্তিরা ইসরায়েলের কারাগারে বন্দী ফিলিস্তিনিদের মুক্তির বিপক্ষে ও গাজা দখলের পক্ষে সোচ্চার। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও অক্টোবরে যে চুক্তিতে তাঁর দেশ অঙ্গীকার করেছিল, তা সম্মান করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেছেন, ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় থেকে যাবে। তাঁর কথায়, শেষ পর্যন্ত এতে সেখানে আরও ইহুদি বসতি স্থাপনের পথ তৈরি হবে।
গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হলে ইসরায়েলের সামরিক স্বাধীনতার পথ সংকুচিত হবে। তখন সেখানে আবার প্রবেশ করা বা হামলা চালানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। যুদ্ধবিরতির সম্মতি সত্ত্বেও ১০ অক্টোবরের পর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ৪০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আবার রাজনৈতিকভাবে, কোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক শক্তিকে গাজা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া মানে, এ সংঘাতকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা, যা নেতানিয়াহু চান না। কারণ, এতে অনেক কৌশলগত, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হলে ইসরায়েলের সামরিক স্বাধীনতার পথ সংকুচিত হবে। তখন সেখানে আবার প্রবেশ করা বা হামলা চালানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। যুদ্ধবিরতির সম্মতি সত্ত্বেও ১০ অক্টোবরের পর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ৪০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
এটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে দেওয়া একটি ছাড় হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে। এতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে নেতানিয়াহুর বারবার করা দাবিগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গ বলেন, ‘নেতানিয়াহু যদি গাজায় কোনো বিদেশি সামরিক বাহিনীকে প্রবেশ করতে দেন, তবে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তাঁর কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতার একটি বড় অংশ হারাবেন। আদর্শিকভাবে তিনি চান, পরিস্থিতি ঠিক যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক। তবে সেই সঙ্গে তিনি যেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না হন, সেটিও চান।’
যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সরাসরি ‘দ্বিরাষ্ট্রীয়’ শব্দ ব্যবহার না করা হলেও ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের রাজনৈতিক দিগন্ত’ নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। তবে নেতানিয়াহু ২০১৫ সাল থেকেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণার বিরোধিতা করে আসছেন।
অতি সম্প্রতি, গত সেপ্টেম্বরে তিনি জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়াকে ‘উম্মাদনা’ বলে আখ্যায়িত করেন। দাবি করেন, ইসরায়েল ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা মেনে নেবে না। ইতিমধ্যে, নেতানিয়াহুর মন্ত্রীরাও পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নতুন ইহুদি বসতি গড়ার কাজ শুরু করেছেন, যা একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে কার্যত কবর দেওয়ার নামান্তর। ফিলিস্তিনিরা বহু বছর ধরেই পূর্ব জেরুজালেমকে তাঁদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।
নেতানিয়াহুর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা: বর্তমানে বহুমুখী সংকটে জর্জরিত নেতানিয়াহু। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ করার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়েও চাপে আছেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার ঘটনায় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
সামনে নির্বাচনের বছর হওয়ায় এসব চ্যালেঞ্জ নেতানিয়াহুর জোট সরকার ও তাঁর ক্ষমতা নড়বড়ে করে দিতে পারে। তবে হামাস, হিজবুল্লাহ বা ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে তিনি আবার নিজেকে ‘যুদ্ধকালীন নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করতে ও নিজের বিরুদ্ধে সমালোচনা কমাতে পারবেন। এতে তাঁর মিত্র ও বিরোধীদের ‘জাতীয় জরুরি অবস্থার’ দোহাই দিয়ে এককাতারে নিয়ে আসা সহজ হবে।
অপরাধ ও দুর্নীতি: রেমা-কালেঙ্গায় গোলাগুলির মামলার আসামিদের প্রকাশ্যে বিচরণ
সারাদেশ: বাগেরহাটে আগুনে পুড়ে বৃদ্ধার মৃত্যু