image

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের হামলা এবং মাদুরোকে আটক, কেন?

রোববার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে গেছে। তাদেরকে অ্যামেরিকান বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রশাসন অনেকদিন ধরে অভিযোগ করছে যে, মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও গ্যাং সদস্য পাঠাচ্ছে। এ নিয়ে ভেনেজুয়েলার ওপর নানারকম চাপ প্রয়োগের পর মার্কিন এই অভিযানের ঘটনা ঘটল। কেন ট্রাম্প প্রশাসনের এই অভিযান, এর পেছনে কী — মাদক না তেল — তা নিয়ে বিবিসির বিশ্লেষণ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অনেকদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলান অভিবাসীর যাওয়ার জন্য সেদেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে দোষারোপ করছেন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০১৩ সাল থেকে প্রায় আট মিলিয়ন ভেনেজুয়েলান অর্থনৈতিক সংকট ও দমন-পীড়ন থেকে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা।

তবে প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, মাদুরো তার কারাগার ও মানসিক হাসপাতাল খালি করে বন্দিদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছেন। আর

ট্রাম্প মাদকের, বিশেষ করে ফেন্টানিল ও কোকেন, বিরুদ্ধে এক ধরণের যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

তিনি দুটি ভেনেজুয়েলান অপরাধী গোষ্ঠীকে — ট্রেন দে আরাগুয়া ও কার্টেল দে লস সোলেস — বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে পরেরটি মাদুরোর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, কার্টেল দে লস সোলেস কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী নয়, বরং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত একটি নাম, যাদের বিরুদ্ধে কোকেন পরিবহনে সহায়তা করার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

আর মাদুরোকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ট্রাম্প পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করেছেন। এবং তার সরকারকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে মাদুরো পরিস্কার করেই বলেছেন যে তিনি কোনো কার্টেলের নেতা নন। তার পাল্টা অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ দখল করতে।

ভেনেজুয়েলা কি আসলেও যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাঠায়?

মাদকবিরোধী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক মাদক পাচারে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে ছোট। দেশটি মূলত একটি ট্রানজিট পয়েন্ট, যার মাধ্যমে অন্য দেশে উৎপাদিত মাদক চোরাচালান হয়।

ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী কলম্বিয়া বিশ্বের বৃহত্তম কোকেন উৎপাদক, তবে এর বেশিরভাগই অন্য পথে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়, ভেনেজুয়েলার মাধ্যমে নয়।

মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো কোকেনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথে আসে, আর ক্যারিবিয়ান দিয়ে আসে খুব সামান্য অংশ।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কথিত মাদকবিরোধী প্রাথমিক হামলাগুলো ক্যারিবিয়ানে চালানো হয়েছিল। সাম্প্রতিক হামলাগুলো প্রশান্ত মহাসাগরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প মার্কিন সামরিক নেতাদের বলেছেন, লক্ষ্যবস্তু করা নৌকাগুলোতে সাদা গুঁড়োর ব্যাগ স্তূপ করে রাখা হয়েছে, যা মূলত ফেন্টানিল এবং অন্যান্য মাদক।

ফেন্টানিল একটি সিনথেটিক মাদক, যা হেরোইনের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী এবং যুক্তরাষ্ট্রে ওপিওয়েড অতিরিক্ত সেবনে মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।

১৫ ডিসেম্বর ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে ফেন্টানিলকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন এটি "নারকোটিকের চেয়ে রাসায়নিক অস্ত্রের কাছাকাছি"।

ফেন্টানিল মূলত মেক্সিকোতে উৎপাদিত হয় এবং প্রায় একচেটিয়াভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায় স্থলপথে দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে। ডিইএ-এর ২০২৫ সালের ন্যাশনাল ড্রাগ থ্রেট অ্যাসেসমেন্টে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়া ফেন্টানিলের উৎস হিসেবে ভেনেজুয়েলার নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এখানে এলো কী করে পরিস্থিতি?

গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাদুরো সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। প্রথমেই ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে ধরিয়ে দেওয়ার তথ্যের জন্য ঘোষিত পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক বহনের অভিযোগে অভিযুক্ত নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা শুরু করে।

এরপর থেকে ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে এমন নৌযানের ওপর ৩০টির বেশি হামলা হয়েছে, যেখানে ১১০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তারা একটি অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত, যেখানে অভিযুক্ত মাদক পাচারকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অনিয়মিত যুদ্ধ চালাচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হামলা বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে নয়।

সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ চালানো প্রথম হামলাটি বিশেষভাবে সমালোচিত হয়েছে, কারণ সেখানে একবার নয়, দু’বার হামলা হয়েছিল; প্রথম হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা দ্বিতীয় হামলায় নিহত হন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর বিবিসিকে বলেছেন, সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানটি শান্তিকালে বেসামরিকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত হামলার মধ্যে পড়ে।

এর প্রতিক্রিয়ায় হোয়াইট হাউস বলেছে, তারা সশস্ত্র সংঘাতের আইন মেনে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রকে কার্টেল থেকে রক্ষা করতে।

অক্টোবরে ট্রাম্প বলেন, তিনি সিআইএ-কে ভেনেজুয়েলার ভেতরে গোপন অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছেন। তিনি আরও হুমকি দেন স্থলভাগে হামলার, যাদের তিনি মাদক-সন্ত্রাসী বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, এমন প্রথম হামলা চালানো হয়েছে ২৪ ডিসেম্বর। যদিও তিনি ওই বিষয়ে খুব কম তথ্য দেন। তিনি শুধু বলেন এটি একটি ডক এলাকাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল যেখানে নৌকায় মাদক বোঝাই করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ট্রাম্প বারবার বলেছেন, মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু নয় এবং তার জন্য চলে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

তিনি মাদুরোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়ান। সব নিষিদ্ধ তেলবাহী জাহাজের ওপর সম্পূর্ণ নৌ অবরোধ ঘোষণা করে।

যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে বিশাল সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে, যার ঘোষিত লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল ও কোকেনের প্রবাহ বন্ধ করা।

মাদক পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি এই বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ক্যারিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মোতায়েন বাহিনী — সংখ্যা কত?

যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ায় ১৫ হাজার সেনা এবং একাধিক বিমানবাহী রণতরী, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ও উভচর আক্রমণ জাহাজ মোতায়েন করেছে। এই বহরের মধ্যে রয়েছে ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী।

১০ ডিসেম্বর ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে একটি তেলবাহী জাহাজ দখলের আগে মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো এই রণতরী থেকে উড্ডয়ন করে বলে জানা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ওই জাহাজটি ভেনেজুয়েলা ও ইরান থেকে নিষিদ্ধ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ভেনেজুয়েলা এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা বলে অভিহিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এরপর ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় অঞ্চলে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি, ক্রেতা কারা?

তেলই মাদুরো সরকারের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস। মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখল করতে পারে।

তিনি ট্রাম্পের একটি মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যে মন্তব্য তিনি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে প্রথম তেলবাহী জাহাজ দখল করার পর।

সাংবাদিকরা যখন জাহাজ ও এর তেলের কী হবে জানতে চান, ট্রাম্প বলেন: “আমার ধারণা আমরা তেল রেখে দেব।”

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে অস্বীকার করেছেন যে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল দেশের অপ্রচলিত তেল সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

ভেনেজুয়েলার বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে এবং তেল খাতের আয় সরকারি বাজেটের অর্ধেকের বেশি অর্থায়ন করে।

তবে এর রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের অভাব এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভেনেজুয়েলা বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের মাত্র ০.৮% উৎপাদন করেছে।

বর্তমানে দেশটি দৈনিক প্রায় ৯ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে এবং এর সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি