image

যুক্তরাষ্ট্র কি ভেনেজুয়েলা ‘চালাতে’ পারে, আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে

রোববার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬
বিদেশী সংবাদ মাধ্যম

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর তুলে নিয়ে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’। মাদুরোকে তুলে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা শাসন—এই দুটি বিষয় আন্তর্জাতিক আইন ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে নজিরবিহীন কিছু আইনি প্রশ্ন সামনে এনেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখনো বিস্তারিতভাবে তাদের এই পদক্ষেপের আইনি ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে অতীতের কিছু অভিযান এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মন্তব্য থেকে কিছু ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

১৯৮৯ সালে বুশ প্রশাসন পানামার নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ধরতে সেখানে অভিযান চালিয়েছিল। তখন তারা এই অভিযানকে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সামরিক সহায়তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। মাদুরোর মতো নরিয়েগার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছিল। পেন্টাগন একইভাবে মাদুরোকে তুলে নেওয়ার অভিযানকে বিচার বিভাগের প্রতি ‘সহায়তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ভেনেজুয়েলায় অভিযান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি ভিত্তি নিয়ে বিস্তারিতভাবে নিচে আলোচনা করা হলো—

যুক্তরাষ্ট্রের কি ভেনেজুয়েলা ‘শাসন’ বৈধশনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প যখন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই দেশ ‘চালাবে’ বা যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ভেনেজুয়েলা চলবে। তখন তাঁর কথায় ইঙ্গিত ছিল, তিনি মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে তাঁর কথা মানতে বাধ্য করবেন।

নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ট্যাবলয়েড দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ভেনেজুয়েলা চালাতে সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, যদি ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরা যা চাই তা করেন, তবে আমাদের সেটা করতে হবে না।’

এখন প্রশ্ন হলো, দেলসি রদ্রিগেজ যদি ট্রাম্পের কথা মানতে অস্বীকার করেন, তবে তিনি কীভাবে দেশটি চালাবেন? ট্রাম্প এর কোনো আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করেননি, যা আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। তবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের এও বলেছেন, দেশের তেলের স্বার্থে সেখানে সরাসরি সৈন্য পাঠাতে হলে তিনি তাতে মোটেই ‘ভীত নন’। এখন প্রশ্ন হলো, দেলসি রদ্রিগেজ যদি ট্রাম্পের কথা মানতে অস্বীকার করেন, তবে তিনি কীভাবে দেশটি চালাবেন? ট্রাম্প এর কোনো আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করেননি, যা আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে।

‘কারডোজো স্কুল অব ল’–এর অধ্যাপক রেবেকা ইংবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ কোনো আইনি পথ তিনি দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক আইনে একটি অবৈধ দখলদারত্বের মতো শোনাচ্ছে এবং ঘরোয়া আইনেও প্রেসিডেন্টের এমন কিছু করার ক্ষমতা নেই। ইংবার আরও যোগ করেন, এটি করতে গেলে ট্রাম্পের কংগ্রেসের কাছ থেকে তহবিলের প্রয়োজন হবে। পানামা অভিযানের সময় বিচার বিভাগের আইনি পরামর্শক অফিস (ওএলসি) দাবি করেছিল, মার্কিন ফৌজদারি মামলার কোনো পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করার জন্য বিদেশে এফবিআই পাঠানোর ‘সহজাত সাংবিধানিক ক্ষমতা’ বুশের আছে, এমনকি যদি সেই অভিযানে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হয়ে থাকে তবুও।

১৯৮৯ সালের পানামা অভিযান এখানে খুব একটা বড় উদাহরণ হতে পারে না। সে সময় নরিয়েগা নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করলে বিরোধদলীয় প্রার্থী গুইলারমো এনদারাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে শপথ পাঠ করানো হয়েছিল। তখন এনদারাই পানামা চালিয়েছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব নেননি।

মাদুরোকে তুলে আনা কি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে আনা জাতিসংঘের সনদের লঙ্ঘন বলে মনে হচ্ছে, যে সনদ যুক্তরাষ্ট্রও স্বাক্ষর করেছে। জাতিসংঘের সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য কোনো দেশের সার্বভৌম অঞ্চলে অনুমতি ছাড়া, আত্মরক্ষা ছাড়া বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তাঁকেও বন্দী করা হয়েছে। বিচারের জন্য তাঁকেও যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি ঘোষণা করেছেন, তাঁকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র যখন বিদেশের মাটিতে ড্রোন হামলা চালায়, তখন তারা দাবি করে, সেই দেশের সরকারের অনুমতি আছে অথবা এটি আত্মরক্ষার জন্য করা হয়েছে। কিন্তু কাউকে বিচারের জন্য গ্রেপ্তার করা ‘আইন প্রয়োগকারী’ কাজ, এটি কোনো ‘আত্মরক্ষা’ নয়।

১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য পানামায় অভিযানের নিন্দা জানানোর পক্ষে ভোট দিয়েছিল। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৭৫-২০ ভোটে এটিকে ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখ-তার চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এই জায়গাটি আরও বেশি জটিল। স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোকে দেশের ‘সর্বোচ্চ আইন’ হিসেবে গণ্য করে মার্কিন সংবিধান এবং প্রেসিডেন্টের ওপর দায়িত্ব দেয়, যেন ‘আইনগুলো সঠিকভাবে পালন করা হয়’।

কিন্তু সরকারি আইনজীবীরা এমন তত্ত্ব সামনে আনেন, সংবিধান কখনো কখনো প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে বিদেশে শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা দিয়ে থাকে।যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ কোনো আইনি পথ তিনি দেখছেন না। এটি আন্তর্জাতিক আইনে একটি অবৈধ দখলদারত্বের মতো শোনাচ্ছে এবং ঘরোয়া আইনেও প্রেসিডেন্টের এমন কিছু করার ক্ষমতা নেই।

উদাহরণস্বরূপ, পানামা অভিযানের সময় বিচার বিভাগের আইনি পরামর্শক অফিস (ওএলসি) দাবি করেছিল, মার্কিন ফৌজদারি মামলার কোনো পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করার জন্য বিদেশে এফবিআই পাঠানোর ‘সহজাত সাংবিধানিক ক্ষমতা’ বুশের আছে, এমনকি যদি সেই অভিযানে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হয়ে থাকে তবুও। এই মতবাদে স্বাক্ষর করেছিলেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম পি বার। পরে প্রকাশ পাওয়া তাঁর এই যুক্তির বেশ সমালোচনা করেছিলেন আইনবিশেষজ্ঞরা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক আইনজীবী ব্রায়ান ফিনুকেইন ২০২০ সালের একটি প্রবন্ধে যুক্তি দিয়েছিলেন, পি বারের মেমো দুটি বিষয়কে ভুলভাবে গুলিয়ে ফেলেছে। ফলে দুটি প্রশ্ন উঠছে।

একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কংগ্রেস যদি আলাদা কোনো আইন না করে, তবে মার্কিন আদালত কোনো স্বাক্ষরিত চুক্তি কার্যকর করতে পারে কি না। অন্য প্রশ্নটি হচ্ছে, আদালত কার্যকর করতে পারুক আর নাই পারুক—সব স্বাক্ষরিত চুক্তিই সেই ধরনের আইন কি না, যা প্রেসিডেন্ট সাংবিধানিকভাবে মানতে বাধ্য। ফিনুকেইন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘের সনদ মানতে বাধ্য এবং এটি স্বাক্ষরের সময়ও তা–ই বোঝা গিয়েছিল। এমনকি কোনো আদালত যদি তাঁকে এটি মানতে বাধ্য করার নির্দেশ না–ও দেন, তবু তিনি মানতে বাধ্য। তবে সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় দেননি।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বোমা হামলা আসলে কীজয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মাদুরোকে তুলে আনার জন্য মার্কিন বাহিনীর দলকে বহনকারী হেলিকপ্টারগুলো যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কারাকাসে বড় বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান–দলীয় সিনেটর মাইক লি শনিবার সকালে এক পোস্টে বলেছিলেন, যুদ্ধের ঘোষণা বা সামরিক অভিযানের অনুমতি ছাড়া কোন সাংবিধানিক ভিত্তিতে এই হামলা চালানো হয়েছে, তা জানার অপেক্ষায় আছেন তিনি।

কয়েক ঘণ্টা পর লি জানান, মার্কো রুবিও তাঁকে ফোন করে বলেছেন, আজ রাতে যে হামলা দেখা গেছে, তা মূলত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে যাওয়া কর্মীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য করা হয়েছে। লি বলেন, রুরিও তাঁকে আরও বলেছেন, এই পদক্ষেপ সম্ভবত সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীন প্রেসিডেন্টের ‘সহজাত সুরক্ষা ক্ষমতার’ আওতায় পড়ে, যা মার্কিন কর্মীদের আসন্ন হামলা থেকে রক্ষার অনুমতি দেয়।এটি মূলত ‘সহজাত সুরক্ষা ক্ষমতা’র প্রয়োগ বলে মনে হচ্ছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ফেডারেল আইন কার্যকর করতে যাওয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই প্রেসিডেন্ট তাঁর সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারেন।

ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে অভিবাসন কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে ফেডারেল সৈন্য মোতায়েনের ক্ষেত্রেও এই তত্ত্ব ব্যবহার করেছে। মার্কিন জেনারেল কেইন শনিবার বলেছেন, বেশ কয়েকবার মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো আক্রমণের মুখে পড়েছিল এবং তারা পাল্টা গুলি চালিয়েছিল। মূলত এই অভিযানে মোতায়েন করা ইউনিটের ‘আত্মরক্ষার সহজাত ক্ষমতা’র প্রয়োগ করা হয়েছে। মাদুরোর স্ত্রীর বিষয়ে কী তথ্য আছেমাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তাঁকেও বন্দী করা হয়েছে। বিচারের জন্য তাঁকেও যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি ঘোষণা করেছেন, তাঁকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি