ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কে ম্যানহাটনের একটি আদালতে নেয়া হয়েছে। তাদের আদালতে নেয়ার নাটকীয় ছবি প্রকাশ করেছে বিবিসি। ছবিতে দেখা গেছে, মাদুরোকে হাতকড়া পরিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাকে পাহারা দিয়ে রেখেছে সশস্ত্র কর্মকর্তারা। মাদুরোর সঙ্গে রয়েছেন তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস।
মামদানি ও বার্নি স্যান্ডার্সসহ অনেকেরই নিন্দা
এদিকে, আবারও হামলা চালানোর সম্ভাবনা আছে বলে হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন আদালতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অস্ত্রসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আদালতে নেয়ার আগে ম্যানহাটনে একটি হেলিকপ্টার থেকে নামানো হয় মাদুরো ও তার স্ত্রীকে। তাদের হেলিকপ্টার থেকে নামিয়ে কড়া পাহারায় আদালতে নেয়া হয়। এ সময় মাদুরোকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখা যায়। গত শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরোকে সস্ত্রীক আটক করে পরে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের কারাগারে নিয়ে রেখেছিল। সেখান থেকেই সোমবার, (০৫ জানুয়ারী ২০২৬) তাদের আদালতে হাজির করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাদুরোকে ধরে নিয়ে আসার ব্যাখ্যায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাস ষড়যন্ত্রসহ বেশ কিছু অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়, সেসব ফৌজদারি অভিযোগের জবাবদিহি করার জন্যই আইনি পদক্ষেপ হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করে আনা হয়েছে। মাদুরো (৬৩) কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন।
আবারো হামলার হুমকি ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্র যা চায়, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার যদি সে অনুযায়ী পদক্ষেপ না নেয় তাহলে দেশটিতে আবারও হামলা চালানোর সম্ভাবনা আছে বলে হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প গতকাল রোববার সাংবাদিকদের বলেছেন, ভেনেজুয়েলা তাদের তেল শিল্প উন্মুক্ত করা ও মাদক পাচার বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় সহযোগিতা না করলে তিনি দেশটিতে আরেকটি হামলা চালানোর আদেশ দিতে পারেন। তিনি কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধেও সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়েছেন আর বলেছেন, কিউবার কমিউনিস্ট শাসন ‘নিজে থেকেই পতনের জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে’।
রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের এ মন্তব্যের বিষয়ে ওয়াশিংটনের কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া ট্রাম্প নিজে এ ক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয়ের ভূমিকা থাকার কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অভিযান চালানোর অন্য কারণ হচ্ছে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রমুখি অভিবাসীদের ঢল ও কয়েক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে দেশটির তেল সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত করার সিদ্ধান্ত। গতকাল রোববার ফ্লোরিডা থেকে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেরার সময় এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যা চুরি করেছে আমরা তা ফেরত নিচ্ছি।’
তিনি জানান, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় ফিরবে তারপর দেশটির পেট্রলিয়াম শিল্প পুনর্নির্মাণ করবে।
তিনি বলেন, ‘তারা শত শত কোটি ডলার ব্যয় করতে যাচ্ছে আর তারা ভূগর্ভ থেকে তেল উত্তোলন করবে।’
এদিকে মাদুরো না থাকলেও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাই ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় আছেন আর তারা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করে যাচ্ছেন।
দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট আছেন।
রদ্রিগেস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছেন বলে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, কিন্তু ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীপ্রধান তা বাতিল করে দিয়েছেন। রদ্রিগেস এক সময় ভেনেজুয়েলার তেলমন্ত্রীও ছিলেন। তাকে মাদুরোর ইনার সার্কেলের সবচেয়ে বাস্তববাদী সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিউবার ৩২ নাগরিক নিহত
প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও অভিযান চলাকালে কিউবার ৩২ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে দেশটির সরকার জানিয়েছে। কিউবার সরকার গতকাল রোববার জানায়, যারা নিহত হয়েছেন তাদের সম্মান জানাতে ৫ ও ৬ জানুয়ারি, দুই দিন শোক পালন করা হবে আর তাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কার্যক্রম পরে ঘোষণা করা হবে।
রয়টার্স জানিয়েছে, কিউবার সরকারের দেয়া বিবৃতিতে বিস্তারিত বলা না হলেও যারা নিহত হয়েছেন তারা দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সদস্য বলে জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে কিউবা সরকার বলেছে, ‘আমাদের স্বদেশীরা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত তাদের দায়িত্বের প্রতি অটল থেকে মর্যাদা ও বীরত্বের সঙ্গে তাদের দায়িত্বপালন করেছেন আর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সরাসারি লড়াই করে অথবা তাদের স্থাপনাগুলোতে বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও তীব্র প্রতিরোধের পর মৃত্যুবরণ করেছেন।’
মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কিউবা তার কিছু নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল। নিহত কিউবানদের মধ্যে কতজন মৃত্যুর সময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে পাহারা দিচ্ছিলেন আর অন্য জায়গায় কতজনের সম্ভাব্য মৃত্যু হয়েছে তা পরিষ্কার হয়নি।
ভেনেজুয়েলার স্থানীয় সময় শনিবার ভোররাতে মার্কিন বাহিনী রাজধানী কারাকাসে সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরো (৬৩) ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে সরব বার্নি স্যান্ডার্সসহ অনেকেই
ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনা উচিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের? এ প্রশ্নে কেবল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও তুমুল সমালোচনা চলছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স থেকে শুরু করে কমলা হ্যারিস এমনকি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিও ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছেন।
গতকাল রোববার সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে ট্রাম্পের পদক্ষেপের নিন্দা করেন ভারমন্ট থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডারস।
তিনি ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘বেআইনি, বিপজ্জনক, সংধিান ও আন্তর্জাতিক আইন ভাঙা’ পদক্ষেপ এমনকি প্রসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিরও পরিপন্থী বলে বর্ণনা করেন।
স্যান্ডার্স বলেন, ট্রাম্প ‘আমেরিকা সর্বাগ্রে’ শপথে প্রচার চালিয়েছিলেন। আর এখন তিনি ভেনেজুয়েলায় শাসনক্ষমতা পরিচালনা করতে চান? যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই নাগরিকরা নানা সমস্যায় আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ট্রাম্পের দেশের এই প্রধান সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেয়া উচিত। বিদেশে অবৈধ দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানের ইতি টানা উচিত তার।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিও নিন্দা করেছেন ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণের। তার কথায়, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। এভাবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা শুধু বিদেশে বসবাসকারীদের ওপরই নয় বরং নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের ওপরেও প্রভাব ফেলবে। কারণ, নিউইয়র্কে হাজার হাজার ভেনেজুয়েলার নাগরিক বাস করে।
সারাদেশ: আক্কেলপুরে ভাজা বিক্রেতার আত্মহত্যা