ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্ব গাজায় দখলের সীমানা আরও বাড়িয়েছে। গাজা সিটির তুফাহ, শুজাইয়া ও জেইতুন এলাকায় এই সীমানা বাড়ানোর ফলে ফিলিস্তিনিরা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আলজাজিরার মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, সোমবার ইসরায়েলি বাহিনীর এই তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ সালাহ আল-দিন সড়কের কাছে চলে এসেছে। ফলে সেখানে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে ইসরায়েল গাজা ভূখ-ের ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা দখল করে রেখেছে।
গত ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। চুক্তি কার্যকরের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ১৪৫ জন আহত হয়েছেন। আলজাজিরা জানায়, ইয়েলো লাইন (ইসরায়েলের দখল সীমা) বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হলো পূর্বদিকের আরও এলাকা দখল করে নেওয়া এবং মানুষের আশ্রয় নেওয়ার জায়গা কমিয়ে ফেলা। জেইতুন, শুজাইয়া ও তুফাহ এলাকার মানুষ বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। ফলে আশপাশের এলাকাগুলোতে জনসংখ্যা দ্বিগুণ বা তিন গুণ বেড়ে গেছে।
আলজাজিরা আরও জানায়, রাত থেকে মঙ্গলবার, (০৬ জানুয়ারী ২০২৬) সারাদিন ড্রোন ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সোমবার অবরুদ্ধ গাজার দক্ষিণাঞ্চল, অর্থাৎ রাফাহ এবং খান ইউনিসের উত্তর ও পূর্ব দিকে কামানের গোলা ও হেলিকপ্টার থেকে হামলা চালানো হয়েছে।
গুলিতে তিন ফিলিস্তিনি নিহত: দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে গত রোববার পৃথক ঘটনায় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর ও এক জেলে রয়েছেন। ওই জেলেকে গাজার এমন এলাকায় গুলি করা হয়, যা এখন আর ইসরায়েলের দখলে নেই। এ ছাড়া শহরের পূর্বদিকে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অন্য এক ব্যক্তি গুলিতে নিহত হন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এ ঘটনা নিয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেনি।
পশ্চিম তীরে আটক প্রায় ৩০: পশ্চিম তীরে অভিযান চালিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী গতকাল সোমবার প্রায় ৩০ ফিলিস্তিনিকে আটক করে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক ইনাস ইখলাউই। হেব্রনের পশ্চিমে ইধনা শহরে বাড়ি থেকে তাঁকে আটক করা হয়। তুলকারেমের কাছে নূর শামস শরণার্থী শিবিরে অভিযানের সময় ১৫ বছর বয়সী কিশোর ইয়াজান আল-আলুলকেও আটক করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, বেথলেহেমের উত্তরে আইদা শরণার্থী শিবির থেকে ২৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তল্লাশির নামে বাড়িতে ঢুকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া কালকিলিয়া, রামাল্লাহ ও তুবাস থেকেও কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী নিয়মিতভাবে পশ্চিম তীরে রাতে এই ধরনের অভিযান চালিয়ে থাকে।
এদিকে, ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন নিয়ে আলোচনা শুরু হচ্ছে। আগামী মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় শুরু হওয়া এ আলোচনার নেতৃত্ব দেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দোহায় সম্মেলনে ২৫টির বেশি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বাহিনীর নেতৃত্বের কাঠামোসহ অন্যান্য বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। এই বাহিনী গঠনের জন্য আগামী মাসেই বিভিন্ন দেশের সেনাদের গাজায় মোতায়েন করা হতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে অনেক দেশ আন্তর্জাতিক এই বাহিনীতে অংশ নিতে ইচ্ছুক। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এই বাহিনীর আকার, গঠনপ্রক্রিয়া, আবাসনব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ এবং তাদের কাজের নিয়মাবলি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করছে। যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনা চলার কথা জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটও।
এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গাজায় স্বাস্থ্য ও নির্মাণ-সংক্রান্ত কাজের জন্য সর্বোচ্চ ২০ হাজার সেনা পাঠাতে প্রস্তুত।
দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রিকো সিরাইত বলেন, ‘এটি এখন পর্যন্ত প্রাথমিক ও প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে রয়েছে। যে বাহিনী মোতায়েন হবে, এখন তার গঠনপদ্ধতি প্রস্তুত করছি আমরা।
গত ১০ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। বর্তমানে উপত্যকাটির ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হামাস নিয়ন্ত্রিত বাকি এলাকায় বসবাস করছেন গাজার ২০ লাখ বাসিন্দা। যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজায় যেসব এলাকা ইসরায়েলের দখলে রয়েছে, সেখানে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।