সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নেয়ার পর এবার দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক বার্তায় ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমঝোতা হয়েছে। এর আওতায় প্রথম ধাপে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল ‘উচ্চমানের কিন্তু নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত’ অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হবে। খবর আনাদোলুর।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল উচ্চমানের অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করতে সম্মত হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত দরে এই তেল বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা—উভয় দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে।ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘এই তেল স্টোরেজ জাহাজে করে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে আনা হবে এবং বাজারমূল্যে বিক্রি করা হবে। পরিকল্পনাটি দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ আমি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইটকে দিয়েছি।’
এ বিষয়ে আরও তথ্য জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে তেল পাঠানোর বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে এবং প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটি স্বাভাবিকভাবে তেল রপ্তানি করতে পারছে না। ট্রাম্প প্রশাসন এই উদ্যোগকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের নতুন কৌশল হিসেবে তুলে ধরছে।
এর আগে গত শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। হামলায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। একই সময় বিশেষ অভিযানে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। মাদক ও অস্ত্র পাচারের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে বিচার শুরু হয়েছে, যদিও প্রথম শুনানিতে তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন এই সামরিক অভিযানকে ‘মনরো নীতির পুনর্বহাল’ এবং মাদক পাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিশ্চিত করাও এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে তেলসমৃদ্ধ দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য সংস্থা ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে কমপক্ষে ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে—যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
তবে বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে দেশটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা বৈশ্বিক দৈনিক তেল সরবরাহের মাত্র শূন্য দশমিক আট শতাংশ।
ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল তুলনামূলকভাবে ভারী ও ঘন প্রকৃতির। এ ধরনের তেল উত্তোলন ও পরিশোধনে বাড়তি প্রযুক্তি ও সতর্কতা প্রয়োজন হলেও, এর মাধ্যমে উন্নতমানের ডিজেল, অ্যাসফল্ট, শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানি এবং ভারী যন্ত্রপাতির জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রে নেয়ার এই ঘোষণা শুধু জ্বালানি বাণিজ্যের বিষয় নয়; বরং এটি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।