যখন মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের একদম কেন্দ্রে বিতর্কিত এক অভিযানের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো লাতিন আমেরিকায় নিযুক্ত চীনের বিশেষ দূত চিউ শিয়াওছির সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তুলছিলেন এবং বেইজিংয়ের নেতৃত্বের প্রশংসা করছিলেন। কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে হাসিমুখে কথা বলার সময় মাদুরো চীনের কূটনীতিক চিউ শিয়াওছিকে বলছিলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে তার ভ্রাতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাই, তিনি বড় ভাইয়ের মতো।’
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ‘ডেল্টা ফোর্স’-এর কমান্ডোরা স্ত্রীসহ মাদুরোকে তার শয়নকক্ষ থেকে তুলে নিয়ে যান। ফলে চীন এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তারা লাতিন আমেরিকায় তাদের অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলল।
চীন-ভেনেজুয়েলা সম্পর্ক: চীন ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক আদর্শের মিল ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি দুজনেরই অনাস্থা এই বন্ধুত্বকে আরও মজবুত করেছে। ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে ‘যেকোনো পরিস্থিতির উপযোগী কৌশলগত অংশীদারত্ব’ তৈরি হয়, যার ফলে বেইজিং ভেনেজুয়েলাকে বিপুল অর্থনৈতিক সাহায্য ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছিল। ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেলের বড় অংশ যায় চীনে। আর চীনের কোম্পানিগুলো সেখানে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ দুই দেশের সেই সম্পর্কে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, ভেনেজুয়েলার তেল এবং এই অঞ্চলে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের ভবিষ্যৎ কী হবে।
চীনের প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক: বেইজিং এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বের মোড়ল’-এর মতো আচরণ করার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘উইবো’তে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। গত সোমবার রাত পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত পোস্টগুলোতে ৬৫০ কোটির বেশি ভিউ হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বাড়ির পেছনের দেশ (ভেনেজুয়েলা) থেকে একজন নেতাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে, তবে চীন কেন তাইওয়ানের ক্ষেত্রে এমনটা করতে পারবে না? চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে আসছে। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তা দখলের শপথ নিয়ে রেখেছে।
চীনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান: অনলাইনে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাইওয়ান দখলের উত্তেজনা থাকলেও চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘দাদাগিরি’ বা হীন কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিয়ে বলেন, ‘একতরফা গুন্ডামি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা নষ্ট করছে।’ তিনি সব দেশকে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া লিখেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র যাকে “নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা” বলে, আসলে তা তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা আর লুটপাটের এক ব্যবস্থা।’
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে চীন এখন সরব হলেও ২০২২ সালে যখন রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল, তখন চীন রাশিয়ার নিন্দা না করে উল্টো যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোকেই দোষ দিয়েছিল।
তেল সরবরাহ ও অর্থনীতি: বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভেনেজুয়েলার এ ঘটনায় চীনের তেল সরবরাহে খুব বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, ভেনেজুয়েলার বর্তমান তেল উৎপাদন অনেক কমে গেছে। তাছাড়া চীনের যেসব ছোট বেসরকারি শোধনাগার ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি তেল কিনত, তারা মূলত সস্তায় পাওয়ার কারণেই কিনত। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীন হয়তো তেল কেনা চালিয়ে যেতে পারবে। তবে সেই বিশাল ছাড় আর থাকবে না। গত ১০ বছরে চীন ভেনেজুয়েলাকে ৬ হাজার ২০৫ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে, যা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশে চীনের দেওয়া ঋণের অর্ধেক। ফলে ভেনেজুয়েলা বিশ্বের বৃহত্তম চীনা অর্থ সহায়তাপ্রাপ্ত দেশে পরিণত হয়েছিল।
‘তাইওয়ান ভেনেজুয়েলা নয়’: ভেনেজুয়েলার ঘটনা দেখে চীন উৎসাহিত হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে তাইওয়ান খুব একটা বিচলিত নয়। তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা ওয়াং টিং-ইউ বলেন, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্র নয়, আর তাইওয়ানও ভেনেজুয়েলা নয়। চীন সব সময়ই তাইওয়ানের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে। কিন্তু তাদের সেই সক্ষমতা (যুক্তরাষ্ট্রের মতো) নেই।’ বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম ইয়াং বলছেন, এ ঘটনা তাইওয়ান দখলের ব্যাপারে চীনের পরিকল্পনাকে সরাসরি বদলে দেবে না। কারণ, তাইওয়ান দখল করতে হলে চীনকে তার নিজের অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতার কথা ভাবতে হবে।
তবে ওই আইনপ্রণেতা সতর্ক করে বলেন, ‘তাইওয়ানের জন্য শিক্ষা হলো, পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজনে সামরিক শক্তির ব্যবহার এখন পৃথিবীতে ‘নতুন এক স্বাভাবিক’ বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। তাইওয়ানকে নিজের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে।’
লাতিন আমেরিকায় প্রভাব: রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক ড্যান ওয়াং বলছেন, মাদুরোর পতন বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় কৌশলগত ধাক্কা। তবে বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে চীনের যে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, সেখান থেকে চীনা কোম্পানিগুলোকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। কারণ, তাতে ওই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বেইজিং এখন হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থটুকু রক্ষার চেষ্টা করবে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার সমমূল্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে কারাকাস। গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এ চুক্তির ফলে ভেনেজুয়েলার তেলের সরবরাহ এখন চীনের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঘুরবে এবং ভেনেজুয়েলা বড় ধরনের তেল উৎপাদন হ্রাস এড়াতে সক্ষম হবে।
এ চুক্তি এমন জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাম্পের দাবির প্রতি সাড়া দিচ্ছে। ট্রাম্পের দাবি ছিল, হয় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য দেশটিতে ব্যবসার সুযোগ উন্মুক্ত করতে হবে, না হয় সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি নিতে হবে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চান, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশটির তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্র ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ‘পূর্ণ প্রবেশাধিকার’ দিক।
ট্রাম্পের আরোপিত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ভেনেজুয়েলার লাখ লাখ ব্যারেল তেল বিভিন্ন ট্যাংকার ও স্টোরেজ ট্যাংকে আটকা পড়ে ছিল। এগুলো জাহাজীকরণ করতে পারছিল না দেশটি। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর সরকারের ওপর মার্কিন চাপ বৃদ্ধির অংশ ছিল এই অবরোধ। গত শনিবার মার্কিন বিশেষ বাহিনী মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এ উত্তজনা চূড়ান্ত রূপ নেয়।
ভেনেজুয়েলার শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়ার এ ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের দেশের বিশাল তেল সম্পদ চুরির চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর সরকারের ওপর মার্কিন চাপ বৃদ্ধির অংশ ছিল এই অবরোধ। গত শনিবার মার্কিন বিশেষ বাহিনী মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এ উত্তজনা চূড়ান্ত রূপ নেয়। ভেনেজুয়েলার শীর্ষ কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের দেশের বিশাল তেল সম্পদ চুরির চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা ‘নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা’ ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ‘তুলে দিচ্ছে’। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এ তেল বাজারদরে বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি নিয়ন্ত্রণ করব। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে যে এই অর্থ ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে!’ ট্রাম্প জানান, মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এ চুক্তি কার্যকর করার দায়িত্বে রয়েছেন। তেলবাহী জাহাজগুলো থেকে তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: ইউআইটিএসে শুরু হচ্ছে হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: ভ্রমণের পেমেন্ট বিকাশ করে গ্রাহকরা জিতে নিলো নেপাল ও কক্সবাজার ট্যুর
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বিকাশের নতুন উদ্যোগ ‘বি হাইভ’