ইরানে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ চলছে গত ১২ দিন ধরে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস সংঘর্ষ হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লোরদেগানে সশস্ত্র ব্যক্তিদের গুলিতে দুই পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
এদিকে বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে দেশটির প্রধান বিচারপতি বলেছেন, যাঁরা দেশকে বিশৃঙ্খল করে দেওয়ার উসকানি দিচ্ছেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর উত্তেজনাপূর্ণ মুখোমুখি অবস্থান, পেছনে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। অন্য বিভিন্ন এলাকার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশকে পাথর নিক্ষেপ করতেও দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ইরানের সব ৩১টি প্রদেশের ১১১টি শহর ও জনপদে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলমান অস্থিরতায় অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং চারজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ২ হাজার ২০০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিবিসি পার্সিয়ান ২১ জনের মৃত্যুর ঘটনা ও পরিচয় নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ পাঁচজন নিরাপত্তা সদস্যের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভের সূচনা। রাজধানী তেহরানের দোকানদাররা সেদিন রাস্তায় নেমে আসেন, খোলা বাজারে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের দর আরও এক দফা বড় ধরনের পতনের মুখে পড়লে। গত এক বছরে রিয়াল ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, সরকারের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভে যোগ দেন এবং আন্দোলন দ্রুত অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শোনা যায়। কোথাও কোথাও ইরানের শেষ শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভির প্রতি সমর্থনও প্রকাশ করা হয়।
বুধবার বিবিসি পার্সিয়ান যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের উত্তর-পশ্চিমে কাজভিন শহরে বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক’ এবং ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোন’ স্লোগান দিচ্ছেন। পারস্য উপসাগরীয় বন্দর শহর বন্দর আব্বাসের ফুটেজে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা ‘পুলিশ বাহিনী, সমর্থন করো, সমর্থন করো’ স্লোগান দেওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিয়া পবিত্র নগরী মাশহাদে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয় এবং একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। আরেকটি ভিডিওতে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে উৎখাত হওয়া পাহলভি রাজবংশের পক্ষে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
বুধবার বিকেলে ইরাক সীমান্তের কাছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আবাদানে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়। বিবিসি পার্সিয়ান যাচাই করা ফুটেজে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন, ‘কামান, ট্যাংক, আতশবাজি! মোল্লাদের বিদায় চাই।’ শহরের একটি ভবনের বারান্দা থেকে ধারণ করা অন্য এক ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের পাথর ও অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপের মুখে নিরাপত্তা বাহিনী পিছু হটতে হটতে গুলি ছুড়ছে।
রাত নামার পর পশ্চিমাঞ্চলীয় আরেক শহর আলিগুদারজে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে। এর আগে সেখানে একটি চত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারীরা ‘জনতার অভ্যুত্থান, জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিচ্ছিলেন।
লোরদেগানে বুধবারের বিক্ষোভ চলাকালে দুই পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার খবর দেয় ফার্স। সংস্থাটি জানিয়েছে, নিহত পুলিশ সদস্যদের নাম হাদি আজারসালিম ও মুসলেম মাহদাভিনাসাব। তাদের ‘সশস্ত্র ব্যক্তি’ গুলি করে হত্যা করেছে বলে দাবি করা হয়। ফার্সের ভাষ্য অনুযায়ী হত্যাকারীরা ‘দাঙ্গাকারীদের’ একটি দলের সঙ্গে ছিল।
তবে এই প্রতিবেদন তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারণ, বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর ইরানে সরাসরি প্রতিবেদন করার অনুমতি পায়নি, আর অনুমতি পেলেও তাদের চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। উল্লেখ্য, চলমান অস্থিরতার সময় লোরদেগানে আগেও সহিংস সংঘর্ষ হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সেখানে দুই বিক্ষোভকারী নিহত হন।
বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে নির্বাহী বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাফর কায়েমপানাহ জানান, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার’ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যারা আগ্নেয়াস্ত্র, ছুরি ও চাপাতি বহন করে এবং পুলিশ স্টেশন ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তারা দাঙ্গাকারী। বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গাকারীর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।’
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় কমাতে সরকার ৭ কোটি ১০ লাখ নাগরিককে নতুন মাসিক ভাতা দেওয়া শুরু করেছে, যার পরিমাণ প্রায় ৭ ডলার বা ৫ পাউন্ড।
এদিকে বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি পুলিশ কমান্ডারদের বলেন, দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে ‘দ্রুত’ বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে তা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শনিবার বলেন, কর্তৃপক্ষের উচিত ‘বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলা’, তবে ‘দাঙ্গাকারীদের তাদের জায়গায় বসাতে হবে।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রস্তুত এবং সশস্ত্র।’
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক ড. সানাম ওয়াকিল বলেন, বিক্ষোভ খুব দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে এবং এর পেছনে জনসাধারণের গভীর ক্ষোভ কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ ক্লান্ত। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আশা নেই। দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।’ তাঁর মতে, ‘যদি গতি আরও বাড়ে এবং আরও মানুষ রাস্তায় নামে, তাহলে বিক্ষোভ আরও গুরুতর হবে এবং তখন সরকারের প্রতিক্রিয়াও আরও সহিংস হয়ে উঠবে।’
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক সাদেঘ জিবাকালাম বলেন, ট্রাম্পের হুমকির কারণেই ইরানি কর্তৃপক্ষ হয়তো কঠোর দমন-পীড়নে যেতে কিছুটা বিরত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইরানের কিছু নেতা—বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার ও নিরাপত্তা বাহিনী—সম্ভবত একটু সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তারা তাড়াহুড়া করে দমন করতে চাইছেন না, কারণ এতে মার্কিন হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
সারাদেশ: ফিশিং বোটে নিষিদ্ধ ট্রলিং সরঞ্জাম