image

মাচাদোর পরিবর্তে মাদুরো-ঘনিষ্ঠ দেলসিকেই কেন বেছে নিলেন ট্রাম্প

বিদেশী সংবাদ মাধ্যম

কারাকাসে এই সপ্তাহজুড়ে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাবলির পর থেকেই বহু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে একটি প্রশ্ন যেন বারবার ফিরে আসছে। সেটি হলো—এখন যিনি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ভাষায় ভেনেজুয়েলার ‘অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের’ নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই চশমাধারী নারীকে ঘিরে প্রশ্ন—দেলসি রদ্রিগুয়েজই কেন? নোবেলজয়ী ‘গণতন্ত্রী’ মারিয়া করিনা মাচাদো কেন নয়?

সাবেক মার্কসবাদী গেরিলা নেতার কন্যা এবং ‘অপহৃত’ ভেনেজুয়েলান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহচর দেলসি রদ্রিগুয়েজের মধ্যে এমন কী আছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে? আর কেন ওয়াশিংটন একজন ঘোষিত ‘চাভিস্তা’ বিপ্লবীকে ক্ষমতায় থাকতে দিল, অথচ বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে সমর্থন করল না, যাঁর নেতৃত্বাধীন বিরোধী আন্দোলন ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়?

একজন সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মতে, এর উত্তর খুবই সহজ। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা চার্লস শ্যাপিরো বলেন, ‘তারা গণতন্ত্রের চেয়ে স্থিতিশীলতাকে বেছে নিয়েছে। স্বৈরশাসককে বাদ দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই রেখে দেওয়া হয়েছে। দোসররা সবাই এখনো আছে।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমি মনে করি, এটা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ।’

তবে বিকল্প পথ অর্থাৎ, সম্পূর্ণ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং মাচাদোর বিরোধী আন্দোলনকে ক্ষমতায় আনায়ও ছিল নানা বিপদ। এর মধ্যে ছিল বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সেই সব ভেনেজুয়েলান নাগরিকের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা, যারা—সম্ভবত প্রায় ৩০ শতাংশ—মাদুরোর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

শনিবার সকালে এক নাটকীয় সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অনেককেই চমকে দেন। তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে ভেনেজুয়েলার ভেতরে ‘সম্মানিত নন’ বলে মন্তব্য করেন, আর দেলসি রদ্রিগুয়েজকে আখ্যা দেন ‘মার্জিত’ হিসেবে। কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক ডেপুটি চিফ অব মিশন কেভিন হুইটেকার বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখে মারিয়া কোরিনা মাচাদোর এই কার্যত অযোগ্য ঘোষণার কথা শুনে আমি খুব অবাক হয়েছি। তাঁর আন্দোলন বিপুলভাবে নির্বাচিত হয়েছিল... ফলে মাচাদোকে অযোগ্য ঘোষণা করা মানে কার্যত পুরো আন্দোলনকেই অযোগ্য ঘোষণা করা।’

যে দ্রুততা এবং আপাত সহজভাবে মাদুরোকে সরিয়ে রদ্রিগুয়েজকে বসানো হলো, তাতে কিছু পর্যবেক্ষকের মনে সন্দেহ জাগে—ভেনেজুয়েলার সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্ট কি আগে থেকেই এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন? এই বিষয়ে সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা লিন্ডসি মোরান বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে আমরা শুধু মাদুরোর পেছনে গিয়েছি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট টিকে গেছেন। এটা স্পষ্ট যে ভেতরে উচ্চপর্যায়ের সূত্র ছিল। আমার তাৎক্ষণিক ধারণা ছিল, সেই সূত্রগুলো ভাইস প্রেসিডেন্টের দপ্তরেই ছিল—যদি না স্বয়ং ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।’

তবে কারাকাসে বসবাসরত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফিল গানসন বলেন, এই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব কাছ থেকে দেখলে টেকে না। কারণ, ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ এবং কট্টরপন্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেয়োর হাতেই এখনো বিপুল ক্ষমতা রয়েছে—যাঁরা দুজনই মাদুরোর অনুগত। গানসন প্রশ্ন তোলেন, ‘যাঁদের হাতে আসলে বন্দুক রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় রেখে সে কেন মাদুরোকে বিক্রি করবে?’

তার বদলে, রদ্রিগুয়েজকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত এসেছে এই সতর্কতার পর—মাচাদোকে বসালে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। অক্টোবরে প্রকাশিত এক আইসিজি প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, ‘ওয়াশিংটনের শাসন পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মাদুরো-পরবর্তী যেকোনো পরিস্থিতিতে সহিংসতার ঝুঁকি খাটো করে দেখা উচিত নয়।’ সেখানে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অংশ নতুন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করতে পারে। গানসন বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের লোকজনকে সতর্ক করছিলাম—এটা কাজ করবে না। সহিংস বিশৃঙ্খলা হবে, দোষটা তোমাদের ঘাড়ে পড়বে, আর সেটার দায়িত্বও তোমাদেরই নিতে হবে।’

গত সোমবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, একটি গোপন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নেও একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রদ্রিগুয়েজসহ মাদুরো সরকারের সদস্যরাই একটি অস্থায়ী সরকার চালানোর জন্য তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছেন। হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও স্পষ্ট করেছে, তারা ভবিষ্যতের জন্য রদ্রিগুয়েজের সঙ্গে কাজ করতে চায়।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আমেরিকাস প্রোগ্রামের সহযোগী ফেলো হেনরি জিমার বলেন, ‘এতে ট্রাম্প প্রশাসনের এক ধরনের কঠোর বাস্তববাদ প্রতিফলিত হয়েছে।’ তবে তিনি সতর্ক করেন, আসল চ্যালেঞ্জ এখনই শুরু। হেনরি জিমার বলেন, ‘মাদুরোকে ধরাই ছিল সহজ অংশ। ভেনেজুয়েলাকে নতুন করে গড়া, তেল, মাদক আর গণতন্ত্রের লক্ষ্য—এসব বাস্তবায়নে অনেক বেশি সময় লাগবে।’

তবে আপাতত, রদ্রিগুয়েজকে এমন একজন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। গানসন বলেন, ‘তিনি কিছুটা অর্থনৈতিক সংস্কারক। অর্থনীতি উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তিনি বোঝেন এবং বিদেশি পুঁজি ফেরাতে তিনি আপত্তি করেন না।’ জিমারও একমত যে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর জন্য দরজা খুলে দেওয়া, মাদকবিরোধী সহযোগিতা বাড়ানো এবং এমনকি কিউবা, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক কিছুটা কমানোর ক্ষেত্রেও রদ্রিগুয়েজ ওয়াশিংটনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হতে পারেন—বিশেষ করে যদি এর বিনিময়ে ধীরে ধীরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। জিমার বলেন, ‘আমি মনে করি, তিনি সেটা করতে পারবেন। কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অগ্রগতি চায়, তাহলে সেটা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।’

এই মুহূর্তে অবশ্য গণতন্ত্র ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারের তালিকায় খুব ওপরে নেই বলেই মনে হচ্ছে। বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার জন্য তিন ধাপের একটি পরিকল্পনার কথা বলেন। প্রথম ধাপে থাকবে দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল বাজারজাত করা। এরপর রুবিওর ভাষায় শুরু হবে ‘সমঝোতার একটি প্রক্রিয়া। যার মধ্যে থাকবে বিরোধী শক্তির জন্য সাধারণ ক্ষমা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং নাগরিক সমাজ পুনর্গঠন। রুবিও বলেন, ‘তৃতীয় ধাপটি অবশ্যই হবে রূপান্তরের।’ তবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

ভেনেজুয়েলার সংবিধানের ২৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রেসিডেন্ট ‘স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম’ হলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। নিউইয়র্কের কারাগারে বিচারাধীন অবস্থায় থাকা মাদুরোর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য বলেই মনে হয়। তবে সোমবার এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, নির্বাচন এখন আলোচনায় নেই। তিনি বলেন, ‘আগে দেশটাকে ঠিক করতে হবে। নির্বাচন করা যাবে না।’

গানসনের মতে, স্বল্পমেয়াদে শাসন পরিবর্তনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তিসংগত হতে পারে, কিন্তু মধ্যমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির অভাব হতাশাজনক। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প হয়তো এর থেকে কিছু পাচ্ছেন, কিন্তু ভেনেজুয়েলানরা পাচ্ছে না। সাধারণ ভেনেজুয়েলানরা আগের মতোই ঠকছে।’

ট্রাম্প প্রশাসন যখন আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর ভেনেজুয়েলার দুর্নীতিগ্রস্ত ও মৃতপ্রায় তেল অবকাঠামোতে ফের বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছে, তখন বাস্তবতা আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করেন গানসন। তাঁর ভাষায়, ‘যদি সরকার অবৈধ হয় এবং আইনের শাসন না থাকে, তাহলে পুনরুদ্ধারের জন্য যে কয়েক দশ বিলিয়ন ডলার দরকার, তা নিয়ে কেউ এখানে আসবে না।’

২০১৩ সালে মৃত্যুর কিছু আগে ভেনেজুয়েলান সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ যখন নিকোলাস মাদুরোকে উত্তরসূরি মনোনীত করেন, তখন সেটিকে বলা হয়েছিল চাভেজের ‘দেদাসো’—স্প্যানিশ ভাষার একটি শব্দ, যার অর্থ ‘আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া’, অর্থাৎ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত মনোনয়ন। রাষ্ট্রদূত শ্যাপিরোর মতে, দেলসি রদ্রিগুয়েজের ক্ষমতায় আসার ঘটনাতেও সেই মিল রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটি ট্রাম্পের দেদাসো।’

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি