প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকার সেসব বন্দীদের ছেড়ে দেয়া শুরু করেছে, মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে যাদের মুক্তি দাবি করে আসছিল। কারাকাস এ মুক্তিকে ‘সদিচ্ছার নিদর্শন’ হিসেবে অভিহিত করছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এক দ্বৈত নাগরিকসহ তাদের ৫ নাগরিক ভেনেজুয়েলার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এ মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে অধিকারকর্মী রোসিও স্যান মিগুয়েলও আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারাকাসের কাছে মাইকেতিয়া বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছিল, পরে এ নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়। নির্বাচন কিংবা সরকারবিরোধী তুমুল বিক্ষোভের সময় আটক এ ‘রাজনৈতিক বন্দীদের’ ছেড়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই চাপ দিয়ে আসছিল।
ডেলসি রদ্রিগেজের ভাই, ভেনেজুয়েলার পার্লামেন্টে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হর্গে রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক ঘোষণায় বলেছেন, সামনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দী মুক্তি পাবেন। তবে সবমিলিয়ে এ সংখ্যাটি কত হবে এবং তাদের পরিচয় জানাননি তিনি। ভেনেজুয়েলার কারাগারগুলোতে কয়েকশ’ রাজনৈতিক বন্দী আটক আছে, তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকজনকেই ছাড়া হয়েছে। হর্গে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ‘জাতীয় ঐক্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের’ স্বার্থে এ বন্দীদের মুক্তি দিচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ খবরকে ‘সতর্কতার সঙ্গে’ স্বাগত জানিয়েছে। এ সংগঠনগুলোর অনেক সদস্য, কারও কারও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরাও কারাগারে আছেন। মাদুরোর গুরুত্বপূর্ণ সহচর হওয়া সত্ত্বেও ডেলসি রদ্রিগেজ ও তার অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী বলেই মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির তেল সম্পদের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছে তার প্রতিবাদ জানালেও রদ্রিগেজের সরকার শেষ পর্যন্ত তাতেও বাধা দেবে না বলেই অনুমান করা হচ্ছে।
ভেনেজুলেয়ার কুখ্যাত এল হেলিকোইডে কারাগারে এখনও ৫০-৮০ জনের মতো বন্দী আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারাগারটি বন্ধ করে দেয়া হবে বলে মাদুরোকে অপহরণের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বন্দীদের আটকে রাখার কারণে কারাগারটি আন্তর্জাতিক মহলের নজরে পড়ে। এখানে বন্দীদের মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেয়াসহ নানাভাবে অত্যাচার করা হত বলে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো দাবি করে আসছে।
ভেনেজুয়েলার মানবাধিকার গোষ্ঠী প্রোভিয়া সতর্ক করে বলেছে, এল হেলিকোইডে বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা যেন দেশজুড়ে চলা অন্য কারাগারগুলো থেকে নজর না সরাতে পারে।
দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো দীর্ঘদিন ধরেই কারাগারগুলোতে আটক তার অনেক সহযোদ্ধার মুক্তি দাবি করে আসছিলেন।
ফক্স নিউজের অনুষ্ঠান ‘হ্যানিটিতে’ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, মাচাদো ‘আগামী সপ্তাহের কোনো এক সময়’ যুক্তরাষ্ট্রে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কয়েকদিন আগেই উপস্থাপক শন হ্যানিটিকে মাচাদো বলেছিলেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তার নোবেল পুরস্কারটি দিয়ে দিতে চান। ট্রাম্প যদি এই উপহার গ্রহণ করেন? এই প্রশ্নের জবাবে ভেনেজুয়েলার এ নেতা বলেন, ‘সেটি হবে বিরাট সম্মানের।’
সরকার আটককেন্দ্রগুলোকে ভিন্নমত দমন ও বিরোধীদের চুপ করিয়ে দিতে ব্যবহার করছে বলে ভেনেজুয়েলার সরকারবিরোধীরা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো অনেক বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছিল।
২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে দেশটিতে অধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর আইনি দমনপীড়নও বেড়েছিল বলে তাদের দাবি। ভেনেজুয়েলার অ্যাটর্নি জেনারেল তারেক সাব ও সরকারের অন্যরা এসব অভিযোগ বারবারই প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষ্য, ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিক কারণে কাউকে কখনোই বন্দী করেনি। যাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত অপরাধের প্রমাণ মিলেছে, তাদেরই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।