মার্কিন সেনাদের হাতে ধরা পড়ার আগে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা থেকে নিরাপদে অন্য দেশে পাঠিয়ে দিতে আন্তর্জাতিকভাবে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বলে খবর বেরিয়েছে, কিন্তু দেশ ছাড়তে মাদুরোর অনিচ্ছার কারণে শেষ পর্যন্ত সেসব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ক্রিসমাসের প্রাক্কালে ভ্যাটিকানে এক জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অভিজ্ঞ কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী কার্ডিনাল পিয়েত্রো পারোলিন ভ্যাটিকানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রায়ান বার্চকে ডেকে পাঠান ও তার কাছে ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে জানতে চান বলে ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা সরকারি নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে।
ভেনেজুয়েলা নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান পারোলিন। যুক্তরাষ্ট্র কী কেবল মাদক চোরাকারবারিদেরই নিশানা করবে নাকি ভেনেজুয়েলার শাসক পরিবর্তনই তাদের মূল লক্ষ্য, বার্চের কাছে তা জানতে চান তিনি।
ভেনেজুয়েলায় আরও অস্থিতিশীলতা ঠেকানোর লক্ষ্যে এ কার্ডিনাল মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে যোগাযোগে দিনের পর দিন চেষ্টা করে গেছেন। বার্চের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাকালে পারোলিন ইঙ্গিত দেন, রাশিয়া মাদুরোকে আশ্রয় দিতে প্রস্তুত।
‘তাকে (মাদুরো) প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল যেন তিনি চলে যান, তাহলে বাইরে তিনি তার অর্থকড়ি উপভোগ করতে পারবেন। এই প্রস্তাবের অন্যতম অংশ ছিল (প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির) পুতিন তার নিরাপত্তা দিতেন,’ এমনটাই বলেছেন রাশিয়ার প্রস্তাব সম্বন্ধে অবগত এক ব্যক্তি।
মাদুরো ওই প্রস্তাবে ‘কান দেননি’। এর সপ্তাহখানেক পর বিশেষ অভিযান চালাতে পারদর্শী মার্কিন সেনাদের একটি দল ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে তাদের বাসভবন থেকে তুলে নিউইয়র্ক নিয়ে আসে ও মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করে।
ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, ভ্যাটিকানের ওই বৈঠকটি ছিল মার্কিন অভিযানের আগে মাদুরোকে নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে পার করে দিতে মার্কিন এবং রুশ, কাতারি, তুর্ক, ক্যাথলিক চার্চ ও অন্যদের একাধিক প্রচেষ্টার একটি, যেসব প্রচেষ্টার খবর আগে জানা যায়নি। ‘ক্রিসমাসের সময় হওয়া একটি গোপন কথোপকথনের এমন কিছু অংশ প্রকাশ হওয়া হতাশাজনক, যা সেই কথোপকথনের প্রকৃত বিষয়বস্তুকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে না,’ বার্চ-পারোলিন আলোচনার খবর নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টকে এমনটাই বলেছে ভ্যাটিকান।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানো এবং মাদুরোকে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টায় আন্তর্জাতিকভাবে যে বিস্তৃত উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তা বেশকিছু নথিপত্র এবং জনাবিশেক কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাদুরোকে বারবার ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, কিন্তু বাসচালক থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মাদুরো প্রতিনিয়ত সেসব প্রস্তাব খারিজ করেছেন।
মাদুরোকে ‘ধরে আনার পর’ যুক্তরাষ্ট্র এখন তার সহকারী ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করছে। তারা বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর তুলনায় রদ্রিগেজের ওপরই বেশি আস্থা রাখছে বলেও মনে হচ্ছে।
ট্রাম্পের এমন চিন্তার পেছনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাম্প্রতিক এক গোপন প্রতিবেদনেরও ভূমিকা আছে বলে মনে হচ্ছে, যেখানে বলা হয়েছে— মাদুরোর পর তার অনুগতরাই মাচাদো ও তার দলের চেয়ে ভেনেজুয়েলা ভালো চালাতে পারবে।
বিদেশি তেল কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে তার ‘বাস্তববাদী’ অবস্থান এরই মধ্যে অনেকের কাছে প্রশংসিতও হয়েছে। তিনি আমেরিকাবিরোধী নন, তিনি এমনকি (যুক্তরাষ্ট্রের) স্যান্টা মনিকাতে ছিলেনও। তার অবস্থান মতাদর্শবাদীদের থেকে অনেক দূরে,’ বলেছে রদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলা একটি সূত্র। মাদুরো সম্ভবত ওয়াশিংটনের দিক থেকে আসা সংকেত ঠিকমতো পড়তে পারেননি। তাকে দেশ ছেড়ে যেতে বারবার তাগাদা দেয়ার পরও ভেনেজুয়েলার এ প্রেসিডেন্টের বিশ্বাস ছিল, গত বছরের নভেম্বরে ট্রাম্পের সঙ্গে হওয়ার তার ফোনালাপে পরিস্থিতি ভালোর দিকে এগুবে। ‘প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) তাকে বলেছিলেন, আপনি সহজ পথে যেতে পারেন, নয়তো কঠিন পথে,’ বলেছেন হোয়াইট হাউজের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তার ওয়াশিংটনে যাওয়ার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল, মাদুরো হিসাব কষছিলেন, তিনি হয়তো পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত টিকে যেতে পারেন।
এদিকে কার্ডিনাল পিয়েত্রো পারোলিন মাদুরোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে ধৈর্য ধরতে ও সংযমী হতে চাপ দিচ্ছিলেন। ইউক্রেইন নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার মধ্যে রাশিয়া মাদুরোকে গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহও দেখাচ্ছিল।
আরও নানান বিকল্পের কথা ভাবা হচ্ছিল, যার মধ্যে আছে মাদুরোকে তুরস্কে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা কিংবা ব্রাজিলিয়ান ধনী জোস্লেই বাতিস্তার মধ্য মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। ‘এটা (মার্কিন অভিযান) এড়ানোর অনেক সুযোগ পেয়েছিলেন নিকোলাস মাদুরো। তাকে চমৎকার সব প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, তার বদলে তিনি পাগলাটে মানুষের মতো কাজ করার পথ বেছে নিয়েছেন, বেছে নিয়েছেন অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করতে,’ বলেছেন রুবিও।
মাদুরো চলে যাওয়ার পর রদ্রিগেজ তার ক্ষমতা সুসংহত করছেন, যদিও তার কর্তৃত্ব এখনও পুরোপুরি পোক্ত হয়নি। রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানিতে রাজি হওয়ায় হোয়াইট হাউজও আপাতত তার ওপরই আস্থা রাখছে।
নগর-মহানগর: অপারেশন ডেভিল হান্টে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৪৮