মুদ্রার ভয়াবহ পতন ও লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে ইরানের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছে। অনেকেই সরাসরি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান দাবি করছেন। তবে এবারের বিক্ষোভে সরকারের প্রতিক্রিয়া আগের আন্দোলনগুলোর তুলনায় ভিন্ন। ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট বা ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনে যেখানে শাসকগোষ্ঠী দ্রুত দমন-পীড়নে নেমেছিল, সেখানে এবারের বিক্ষোভ তীব্র আকার নেওয়ার পরও নিরাপত্তা বাহিনী শুরুতে ধীর গতিতে প্রতিক্রিয়া দেখায়। নির্মম দমননীতি বেছে না নিয়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রথমে কৃচ্ছ্রসাধনের সংস্কার ঘোষণা করেন, যাতে দরিদ্রদের জন্য ভর্তুকি দিতে তহবিল জোগাড় করা যায়।
কিন্তু এই সাময়িক ব্যবস্থা টেকেনি। দরিদ্র জনগোষ্ঠী কিছুটা শান্ত হলেও সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই মূলত এর খেসারত দেয় এবং তারা আরও বেশি সংখ্যায় বিক্ষোভে যোগ দেয়। অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই রাজনৈতিক বিদ্রোহে রূপ নেয়। অবশেষে ৮ জানুয়ারি সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পরই সরকার কঠোর দমননীতি শুরু করে। প্রশ্ন হলো, এবার রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়া এত আলাদা কেন? বর্তমান বিক্ষোভ হচ্ছে ইসরায়েলের সঙ্গে গত জুনে হওয়া ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের ছায়ায়। ওই সংঘাতের ধাক্কা থেকে ইরানি কর্মকর্তারা এখনো পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেননি এবং তারা ধরে নিয়েই কাজ করছেন যে, যুদ্ধ যেকোনো সময় আবার শুরু হতে পারে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার চেয়ে এই হুমকিকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ, হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের প্রবল আঘাত এবং সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের শাসনব্যবস্থার পতনের ফলে বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকানোর মতো কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা ইরানের হাতে খুব কমই অবশিষ্ট আছে।
এর ওপর নতুন করে যোগ হয়েছে আরেক সমস্যা—দেশের ভেতরে জনপ্রিয় অসন্তোষ উসকে দেওয়া বিদেশি শক্তিকে ঠেকানোর সক্ষমতাও ইরান হারিয়েছে। ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধে ইরানিরা একবার জাতীয় পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং তখন সরকারও প্রতিক্রিয়ায় ধর্মীয় বিধিনিষেধ প্রয়োগ শিথিল করে, বিশেষ করে হিজাব সংক্রান্ত কঠোরতা কমানো হয়। কিন্তু বর্তমান বিক্ষোভ কঠিন দ্বিধায় ফেলেছে। অতিরিক্ত দমন-পীড়ন চালালে যুদ্ধের পর জনগণের সঙ্গে যে নাজুক সমঝোতা তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে পড়তে পারে। আবার বিক্ষোভ বাড়তে দিলে বিদেশি হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ইরানের অবনতিশীল অর্থনীতিও শাসকদের ভাবনায় বড় ভূমিকা রাখছে। দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার সমন্বয়ে দেশটিতে তীব্র মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব তৈরি হয়েছে। এতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জুনের যুদ্ধ এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। যুদ্ধের পরবর্তী ছয় মাসে রিয়ালের মূল্য ৪০ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়েছে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। অনেকেই মনে করতে শুরু করে যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়ায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য দর–কষাকষির সক্ষমতাও কমে গেছে। এর ফলেই দ্রুত পুঁজি পাচার শুরু হয়।
এই বাস্তবতায় ইরানের শাসকদের দৃষ্টিতে, যে অর্থনৈতিক দুর্দশা মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে, তা দেশের ওপর থাকা বহিরাগত হুমকির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তারা মনে রেখেছে, গত বছরের যুদ্ধে ইসরায়েল সাধারণ ইরানিদের সরকারবিরোধী বিদ্রোহে নামার আহ্বান জানিয়েছিল। ইসরায়েলি নেতৃত্বের হিসাব ছিল—ইরানের বহু জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারকে হত্যা করা এবং সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে দিলে দেশের ভেতরের ক্ষুব্ধ জনগণ উঠে দাঁড়াবে এবং দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলবে। তা না হলেও, ইরানের নেতারাই প্রথম স্বীকার করেছিলেন যে তারা জনগণের সমর্থনেই যুদ্ধ টিকে গিয়েছিলেন। তবে একই সঙ্গে তারা বুঝে যান, একটি গণ-অভ্যুত্থানই ছিল ইসরায়েলের যুদ্ধকৌশলের অংশ। এই উপলব্ধিই বর্তমান বিক্ষোভ নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছে।
এই সন্দেহ আরও জোরালো হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন যে, ইরানি সরকার যদি জনগণের ওপর দমন–পীড়ন চালায় তাহলে তাদের উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ অর্থাৎ প্রস্তুত রয়েছে। এই বিক্ষোভের প্রকৃত হুমকি ইরানিরা নিজেরা কী করতে পারবে, সেটিতে নয়; বরং এই আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়ার অজুহাত হয়ে ওঠে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট তুলনা টানা যায় আরব বসন্তের সময় লিবিয়া ও সিরিয়ার সঙ্গে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু দেশ ‘দায়িত্ব রক্ষার’ (Responsibility to Protect) যুক্তি দেখিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ চালায়। জনপ্রিয় আন্দোলনগুলো দ্রুতই বিদেশি নেতৃত্বাধীন সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় রূপ নেয়, যার পরিণতি হয় গৃহযুদ্ধ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেঙে পড়া। লক্ষণীয় যে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ভেতরে সিরিয়া যুদ্ধে অংশ নেওয়া বহু অভিজ্ঞ যোদ্ধা রয়েছেন। তারা নিজ চোখে দেখেছেন, কীভাবে বাইরের সমর্থন পেলে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ অতি দ্রুত গৃহযুদ্ধে পরিণত হতে পারে। লিবিয়া ও সিরিয়ার পরিণতি এড়ানোর তাগিদই আজ ইরানি সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল চালিকাশক্তি।
ইরানি নেতৃত্বের চিন্তায় আরেকটি বড় বিষয় হলো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের কবজায় নেওয়ার ঘটনা। বিশ্বের অন্যদের মতো ইরানের শাসকরাও এতে বিস্মিত হন। এটি আফগানিস্তান ও ইরাকে ২০০০ দশকের শুরুতে, কিংবা এক দশক পর লিবিয়া ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের সরকার পরিবর্তন করেছিল, তার মতো ছিল না। এখানে ট্রাম্প প্রশাসন সেনা মোতায়েন বা রাষ্ট্রগঠন প্রকল্পে না গিয়ে চাভিস্তা ক্ষমতাকাঠামোকে বহাল রেখেই তাকে মার্কিন আধিপত্য মেনে নিতে বা ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপে পড়তে বাধ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্র কি ইসলামিক রিপাবলিকের ক্ষেত্রেও এমন কৌশল নিতে পারে? সে ক্ষেত্রে তারা হয়তো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে হত্যা করতে একটি নির্ভুল সামরিক হামলা চালাতে পারে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানি তেলবাহী জাহাজ আটকাতে পারে এবং এরপর ইসলামিক রিপাবলিকের অবশিষ্ট অংশকে তাদের দাবিতে সম্মত হতে বাধ্য করতে পারে। এই দাবির মধ্যে থাকবে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর। এমনকি শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা না করেও, ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে হাঁটুর ওপর বসিয়ে দিতে পারে।
এই সম্ভাব্য পরিস্থিতির মুখে ইরান প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সম্ভাব্য মূল্য তুলে ধরতে চেয়েছে। ৬ জানুয়ারি ইরানের প্রতিরক্ষা কাউন্সিল কৌশলগত অবস্থান সংশোধন করে ঘোষণা দেয়, ‘হুমকির বস্তুনিষ্ঠ লক্ষণ’ দেখা গেলে ইরান ‘প্রি-এম্পটিভ বা আগেভাগেই ব্যবস্থা’ নিতে পারে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে আগাম হামলা নিশ্চিতভাবেই এমন একটি যুদ্ধ ডেকে আনবে, যা ইরান চায় না এবং যা হয়তো শাসনব্যবস্থার শেষও ডেকে আনতে পারে, তবু ইসলামিক রিপাবলিক এই বার্তা দিতে চায় যে তাকে পরাজিত করা বিনা মূল্যে সম্ভব নয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়ানো গেলেও এবং বর্তমান বিক্ষোভ স্তিমিত হয়ে গেলেও ইরানের অর্থনীতি নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। এর অর্থ, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে জনরোষ আরও বাড়বে। ইসলামিক রিপাবলিক এখন এক ধরনের উভয়সংকটে আটকে আছে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বহিরাগত হুমকি, অন্যদিকে গণ-অভ্যুত্থানের অভ্যন্তরীণ আশঙ্কা। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সহজ কোনো পথ নেই। ইসলামিক রিপাবলিকের সম্পূর্ণ পতন হয়তো এখনই আসন্ন নয়, কিন্তু ইরানের বিপ্লব যে তার শেষ অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।