image

ভেতরে-বাইরের চাপে ইরান, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে?

বিদেশী সংবাদ মাধ্যম

দুটি বিষয় এখন পর্যন্ত স্পষ্ট। প্রথমত, ইরানের মুদ্রা রিয়ালের অবমূল্যায়ন ও মানুষের জীবনমানের ব্যয় বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছে। বিক্ষোভে সহিংসতায় কয়েকজন নিহতের তথ্য দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তবে গত বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধের পর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ও তেহরানভিত্তিক বার্তা সংস্থাগুলোর ওয়েবসাইট প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। ফলে ইরানের স্থানীয় উৎস থেকে তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সে অনুযায়ী অর্থনৈতিক ক্ষোভ বর্তমানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পতন চাইছেন।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলো ইরানের প্রশাসনের যে ভাষ্য তুলে ধরছে তা হলো- ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিজেও তার ভাষণে এমন অভিযোগ করেছেন। আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক হুমকি, ইসরায়েলের মন্ত্রী ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সমর্থন জানানোটাও ‘সরকার বদলের’ চেষ্টার সন্দেহকে জোরালো করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের জীবনমান উন্নয়নের যে দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন, তা এখন বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চে দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিমা অধিকার সংগঠনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, রোববার পর্যন্ত বিক্ষোভে সহিংসতায় ৫৩৮ জন নিহত হয়েছেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় অনেক তথ্য সংগঠনগুলো পাচ্ছে না। তাই ধারণা করছে, বাস্তবে হয়তো নিহতের সংখ্যা আরও বেশি। অন্যদিকে ইরানের শাসকরাও বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ উল্লেখ করে দমনের হুমকি দিয়েছে। রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজেই বলেছেন, দাঙ্গাবাজদের সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেওয়া উচিত নয়। জনগণের বিশ্বাস করা উচিত, সরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

তবে এমন প্রতিশ্রুতিতে অবিশ্বাস বাড়াচ্ছে ইরানের শাসকদের আগের আন্দোলন দমনে নেওয়া পদক্ষেপ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ২২ বছর বয়সী তরুণী মাশা আমিনি নিহতের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তখন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, সরকার বিক্ষোভকারীদের দমনে গুলি করাসহ নানা কায়দা ব্যবহার করেছে। আর ওই ঘটনার দুই বছর পর ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন অন ইরান’ জানিয়েছিল, বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে একে-৪৭ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

চলমান আন্দোলন দমনেও ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) নামানো হয়েছে। পশ্চিমা সংগঠনগুলো নিহতের সংখ্যা নিয়ে যে তথ্য দিচ্ছে, তার বিপরীতে ইরানি কর্তৃপক্ষের এখনও স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যাচ্ছে না। আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমে তারা কেবল নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করেছে- ১০৯ জন।

ভেতরে-বাইরে চাপ: বিক্ষোভ দুই সপ্তাহ পার হওয়া এবং সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত হওয়ার মতো কিছু না থাকাটাই বোঝায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার চাপে আছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যতটুকু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা অনুযায়ী, শুক্রবার খামেনি জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন, সেখানেও আর্থনৈতিক সংকট নিরসনের প্রতিশ্রুতি ছিল না। তিনি কেবল বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

ইরান সরকারের এমন অবস্থা নিয়ে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম স্কাই নিউজ লিখেছে, পরিস্থিতি মোকাবিলার চেয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের দমনমূলক কৌশলকে আরও নিখুঁত করেছে। এর মধ্যে আছে ইন্টারনেট বন্ধ করা, বিপ্লবী গার্ড ও বসিজ মিলিশিয়াদেরকে বিক্ষোভকারী হত্যা, গণগ্রেপ্তার এবং প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের ক্ষমতা দেওয়া।

স্কাই নিউজ লিখেছে, ৩১টি প্রদেশে যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সেটির গতি ধরে রাখা কঠিন। কারণ, এই আন্দোলনে ইরানের ভেতরে অবস্থান করা কোনো স্পষ্ট নেতৃত্ব নেই। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় মানুষ এক ধরনের অন্ধকারে ডুবে আছে। দেশের বাইরে (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে সরকার পতনের ডাক দিয়েছেন ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত রাজবংশের এক সদস্য (রেজা পাহলভি)। কিন্তু এখানেও ইন্টারনেট না থাকাটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার বার্তা কতজন মানুষের কাছে পৌঁছাবে তা স্পষ্ট নয়।

এদিকে, দেশজুড়ে বিক্ষোভ প্রশাসনকে স্বভাবতই চাপে রেখেছে। দ্বিতীয় চাপটি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এ অবস্থায় ইরানের দুর্বলতার ক্ষেত্রটি হলো যথেষ্ট আন্তর্জাতিক মিত্রের সমর্থন না থাকা। জার্মান-ইরানি অধিকারকর্মী ডানিয়েলা সেফেরিও এ বিষয়ে একমত। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ইরানের নেতৃত্ব অনেক দুর্বল অবস্থায় আছে। ইরানের প্রচলিত পারস্পরিক সহযোগী শক্তিও ধীরে ধীরে কমছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত চাপ একত্রে বাড়ছে।

স্কাই নিউজ লিখেছে, ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শাসন বর্তমানে যতটা দুর্বল হয়েছে, আগে কখনও ততটা হয়নি। কিন্তু এই শাসনব্যবস্থা নিজেই এক বিপ্লবের ফসল। ফলে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এখনও দুর্বলতার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছেন না।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি