মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। দশ দিন আগে তিনি বলেছিলেন, ইরানের সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষায় এগিয়ে যেতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের ওই হুমকির সময় বিক্ষোভে দমনপীড়ন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে দমনপীড়নের ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কী করেন তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়া আর কেউ জানেন না, তিনি কী করবেন। তাই, বিশ্ব অপেক্ষা ও অনুমান দুটিই করতে পারে।
কিন্তু কত দিন? গত রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি কঠোর বিকল্প বিবেচনা করছেন। মঙ্গলবার সম্ভাব্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তাঁকে অবহিত করার কথা আছে। ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক ‘সাফল্যের’ পর ট্রাম্প স্বভাবতই আত্মবিশ্বাসী। তিনি নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনাটাকে মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে সফল অভিযানগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এমন প্রেক্ষাপটে তিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান। এবারও আগের মতো পদক্ষেপ কিংবা ইরানি শাসনব্যবস্থার নির্দিষ্ট অংশের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলা- যেটিই চালানো হোক না কেন, ধরে নেওয়া যায় তাদের কাছে সম্ভাব্য আরও বিকল্প আছে। পেন্টাগনের কর্মকর্তারা বলেছেন, নানা গোপন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মধ্যে আছে, সাইবার কিংবা মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী অভিযান। এসব বিকল্পের লক্ষ্য থাকবে ইরানের শাসন কাঠামো বিঘিœত ও শাসকদের বিভ্রান্ত করা। তবে কারাকাসে যেমনটা হয়েছে, সেটির পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, ইরান বর্তমানে কিছুটা দুর্বল হলেও তাদের অবস্থা ভেনেজুয়েলার মতো নয়। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের দেশটি যুদ্ধের বিষয়ে পরিপক্ক। কোনো একজন ব্যক্তিকে তুলে আনলেই পুরো তেহরান ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে যাবে এমন ভাবার সুযোগ নেই।
ডনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের আমলে (১৯৮০) নেওয়া একটি ব্যর্থ অভিযানের কথা উল্লেখ করেছেন। ইরানে বন্দি আমেরিকানদের উদ্ধারে ওই অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু পূর্বাঞ্চলের মরুভূমিতে হেলিকপ্টার ও ইসি-১৩০ পরিবহন বিমান আছড়ে পড়ে। এতে আট সেনা নিহত হন। পরে ইরানের কর্তৃপক্ষ তেহরানে বন্দি কয়েকজনের মুখোশ পরা ভিডিও ছড়িয়ে দেয়। যা মার্কিন প্রশাসনকে অপমানজনক পরিস্থিতিতে ফেলে। ওই ব্যর্থ অভিযান জিমি কার্টারের নির্বাচনী প্রচারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। ফলাফল, পরের নির্বাচনে তিনি হেরে যান।
ওই ঘটনার ৪৬ বছর পরও ওয়াশিংটনের সামরিক হিসাবকে প্রভাবিত করছে একটি বড় প্রশ্ন। ট্রাম্প প্রশাসন আসলে ইরানে কী অর্জন করতে চাইছে? সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সিনিয়র ফেলো উইল টডম্যান বলছেন, ট্রাম্প ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন তা বোঝা কঠিন। কারণ তাঁর লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু এখনও জানা যায়নি।
টডম্যানের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্ভবত ইরানের শাসনব্যবস্থার আচরণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। পুরো শাসন পরিবর্তন নয়। একটি সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে পারমাণবিক আলোচনায় আরও ছাড় পাওয়ার চেষ্টা। এ ছাড়া, দমনপীড়ন বন্ধ এবং এমন সংস্কার কার্যকর করা যা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খুলে দেবে। গত রোববার ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানি শাসনব্যবস্থার কিছু অংশ আলোচনার আগ্রহ দেখাচ্ছে। তারা সম্ভবত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সংলাপ করতে চায়। তবে সোমবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি লেভিট বলেছেন, ইরানি শাসনব্যবস্থার প্রকাশ্য বক্তব্য এবং মার্কিন প্রশাসন আলাদাভাবে যে বার্তা পাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে ভিন্নতা আছে। এ অবস্থায় কূটনীতির পথে এগোনোই প্রথম পছন্দ হবে।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রথমে কূটনীতি অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন ট্রাম্পকে। গত বৃহস্পতিবার ভ্যান্স নিজেও সাংবাদিকদের বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসাটা তাদের (ইরান) জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হতো। কিন্তু ইরানজুড়ে যদি রক্তপাত চলতেই থাকে, তাহলে কূটনীতির পন্থা দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা দিতে পারে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, সীমিত ধরনের অভিযান বিক্ষোভকারীদের উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে শাসনব্যবস্থার কাছে ভবিষ্যতে কঠোর হামলার সতর্কবার্তা দেবে। চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক সহযোগী ফেলো বিলাল সাব বলেন, ট্রাম্পকে শুধু শাসনব্যবস্থার মাঝে আতঙ্ক তৈরির মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
কিন্তু একই সঙ্গে বিলাল সাব উল্লেখ করেছেন, সামরিক পদক্ষেপ বিপরীত ফলও ডেকে আনবে। এটি ইরানের শাসকদের মধ্যে দৃঢ়তা তৈরি করবে। আবার বড় সংখ্যক জনগোষ্ঠীও শাসকদের সমর্থন দিতে শুরু করবে। এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বেশ জটিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও কঠিন করেছে ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো সক্ষমতা। গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতি হওয়ার পরও ইরানের কাছে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র ও প্রক্সি বা প্রতিনিধি গোষ্ঠী অনেকাংশেই ভেঙে গেছে। যেমন- সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন হয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে গেছে। তবে প্রতিরোধ গড়ার মতো পক্ষগুলো তাদের ক্ষমতা একেবারে হারায়নি। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী এবং ইরাকে শিয়া মিলিশিয়াগুলো এখনও কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা রাখে।
এদিকে, ইরানের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু বাড়ি থেকে মার্কিন অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধারের দাবি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। এসব অস্ত্র ও বিস্ফোরক কয়েকটি ‘সন্ত্রাসী সেলের’ সদস্যদের কাছে ছিল বলে জানানো হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দেশটিতে সহিংসতা উসকে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘বিদেশি এজেন্ট’ মোতায়েন করেছে, যাতে পরবর্তীকালে (দেশটির বিরুদ্ধে) সামরিক শক্তি ব্যবহারের অজুহাত তৈরি করা যায়।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানান, দেশের বাইরে থেকে বিক্ষোভকারীদের নির্দেশনা দেওয়ার বেশ কিছু অডিও রেকর্ড কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি অব্যাহত রেখেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। হোয়াইট হাউস বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোসহ ‘অনেক বিকল্প’ তারা বিবেচনায় রাখছে।
ইরানে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। এই বিক্ষোভের জেরে দেশটির সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। দেশটি বলেছে, তারা যুদ্ধ চায় না। তবে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, বরং পাল্টা জবাব দেবে। আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তাঁর দেশ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, তবে তারা আলোচনার পথও খোলা রেখেছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানজুড়ে অস্থিরতা চলছে। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানিও হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তেহরান কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে; মুঠোফোন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশি উসকানিমূলক সহিংসতা ঠেকাতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।