image
ইরানে গত কয়েকদিন ধরে চলছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। দেশের অর্থনৈতিক সংকট থেকে এই বিক্ষোভ। বিক্ষোভে অনেক হতাহত এবং কোথাও কোথাও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটছে

বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ইরান, নিহত ‘দুই হাজার’

সংবাদ ডেস্ক

ইরানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ চরম আকার ধারণ করেছে। বিক্ষোভ দমন করতে না পেরে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান সরকার।

৫ দিন ধরে ইন্টারনেট বন্ধ

যে কোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র হামলা করতে পারে

ইরানও পাল্টজবাব দিতে প্রস্তুত

এ পর্যন্ত ২০০০ লোকের মৃত্যু হয়েছে। এই বিক্ষোভে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উসকানি দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ইরান সরকারের। ইরানে যে কোনো সময় হামলা চালানোর কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরানও মার্কিন হামলা প্রতিহত করতে প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষই যুদ্ধে হুমকি দেয়ার পাশাপাশি আলোচনার পথও খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছে।

ইরানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই অস্থিরতার সূত্রপাত হয়েছে। গত তিন বছরের মধ্যে এটি ইরানের কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে ইরান এমনিতেই তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে রয়েছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ এই আন্দোলন মোকাবিলায় দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছে। তারা অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে হওয়া প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে ‘বৈধ’ বলে অভিহিত করলেও বাস্তবে অত্যন্ত কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করছে।

ইরান সরকার এই অস্থিরতা উসকে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে দাবি করেছে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসীরা’ এই আন্দোলনকে দখল করে নিয়েছে।

ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলমান সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ গত কয়েকদিনে চরম আকার ধারণ করেছে। আলোচনার মাধ্যমে বিক্ষোভ থামাতে না পেরে নিরাপত্তা বাহিনী চরম ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিক্ষোভ দমন করতে ইতোমধ্যে একাধিকবার গুলি বর্ষণ করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। এতে প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার, (১৩ জানুয়ারী ২০২৬)ইরানের একজন সরকারি কর্মকর্তা নিহতের এ তথ্য রয়টার্সকে জানিয়েছেন। দুই সপ্তাহ ধরে চলা দেশব্যাপী অস্থিরতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পর এই প্রথম কর্তৃপক্ষ এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলো।

ইরান সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে তেহরানের মর্গগুলোর ভিডিওতে লাশের স্তূপের দৃশ্য বলে দিচ্ছে দেশটিতে বিক্ষোভ কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে রাতের সংঘর্ষের বেশ কিছু ভিডিও পাওয়া গেছে। এসব ভিডিওতে গোলাগুলি, গাড়ি ও ভবনে অগ্নিসংযোগসহ সহিংস সংঘাতের চিত্র দেখা গেছে।

এবারের অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১০৯ নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি এবং এর পাশাপাশি কয়েকশ’ বিক্ষোভকারীও নিহত হয়েছে বলে ইরানের বাইরে থাকা অ্যাক্টিভিস্টরা দাবি করছেন।

রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ওই ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা কর্মী উভয়পক্ষের মৃত্যুর পেছনে ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন সাধারণ মানুষ আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সে বিষয়ে ওই কর্মকর্তা কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি। এর আগে একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছিল, বিক্ষোভে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কয়েকদিন ধরে তেহরান সরকারের ইন্টারনেট বন্ধ রাখাসহ যোগাযোগের ওপর নানা বিধিনিষেধ থাকায় তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে এই দমন-পীড়ন চললে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ গণবিক্ষোভের মুখে পড়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খোদ ইরানের একজন সংসদ সদস্য। মঙ্গলবার ইরানের পার্লামেন্টে দেয়া এক বক্তব্যে ইয়াজদ প্রদেশের প্রতিনিধি মোহাম্মদরেজা সাবাঘিয়ান বলেন, মানুষের মধ্যে গভীর অসন্তোষ রয়েছে। সরকার ও পার্লামেন্টের কর্মকর্তাদের উচিত দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করা। অন্যথায় একই ধরনের ঘটনা আরও তীব্রভাবে ফিরে আসবে।

গতকাল সোমবার রাতে ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করে এমন যে কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করলে তাদের ওপর ২৫ শতাংশ নতুন শুল্কারোপ করা হবে। বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তেহরান এখনও এই বিষয়ে জনসমক্ষে কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা চীন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, চীন নিজের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ‘একতরফা নিষেধাজ্ঞা’ ও ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’-এরও বিরোধিতা করেছে বেইজিং।

বিক্ষোভ দমনে ট্রাম্প সামরিক ব্যবস্থার হুমকি দিলেও নেপথ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে বলে আভাস পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সংলাপ করা আমাদের দায়িত্ব এবং আমরা অবশ্যই তা করবো। তিনি আরও জানান, তরুণদের ক্ষোভের কারণ বুঝতে সমাজ বিজ্ঞানীদের নিয়ে ওয়ার্কশপ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও জানিয়েছেন, সামরিক হামলা একটি বিকল্প হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে ‘কূটনীতিই সব সময় প্রথম পছন্দ’। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, দেশে যে অস্থিরতা চলছে তাকে প্রতিবাদ বিক্ষোভ বলা যায় না, এটি ‘সন্ত্রাসী যুদ্ধ’। বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার যে হুমকি দিয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, আলোচনার জন্যও।’

দেশজুড়ে হওয়া বিক্ষোভকে ‘সহিংস ও রক্তক্ষয়ী বানানোই হয়েছে’ ট্রাম্পকে হস্তক্ষেপ করার অজুহাত দেয়ার জন্য, গতকাল সোমবার বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এসব বলেছেন বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। আরাগচি বলেছেন, সপ্তাহান্তে সহিংসতা চরম আকার ধারণ করলেও ‘পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’।

গত রোববার থেকে ইরানজুড়ে বিক্ষোভের মাত্রা ও তীব্রতা কমে এসেছে বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর দ্যা স্টাডি অব ওয়ারের ক্রিটিকাল থ্রেটস প্রজেক্ট। দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ, স্টারলিংক স্যাটেলাইটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কড়া পদক্ষেপের কারণে এমনটা হতে পারে বলে ধারণা করছে মার্কিন এ থিংক ট্যাংক।

গতকাল সোমবারের ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে সরকারের পক্ষে বড় বড় সমাবেশের খবর পাওয়া গেছে। তেহরানে সমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতির খবর নিশ্চিত করেছেন আল জাজিরার প্রতিবেদক।

দেশজুড়ে এসব সমাবেশে অংশ নিতে ইরানি কর্মকর্তারা জনগণের প্রতি গত রোববার থেকেই আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। রক্তক্ষয়ী সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করে এ ‘জাতীয় প্রতিরোধ শোভাযাত্রায়’ অংশ নিতে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজিশকিয়ানও অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ

ইরানে গত বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা যাতে বিক্ষোভের খবর বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে না পারে তার জণ্যই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ২০২২ সালের পর ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের মধ্যে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয়া হয়।

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে চার দিন ধরে বন্ধ থাকা ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরায় চালু করতে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্স কোম্পানির স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা ‘স্টারলিঙ্ক’ ব্যবহার করে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ ফিরিয়ে দেবেন কিনা, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি (মাস্ক) এই ধরনের কাজে খুব দক্ষ, তার একটি চমৎকার কোম্পানি রয়েছে।’

২০২২ সালে ইরানে পুলিশ হেফাজতে মাশা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের সময়ও তৎকালীন বাইডেন প্রশাসন ইলন মাস্কের সহায়তায় ইরানিদের জন্য স্টারলিঙ্ক সেবা চালু করেছিল। ইউক্রেইন যুদ্ধের সময়ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২৫ শতাংশ শুল্কারোপের হুমকি ট্রাম্পের

ইরানের সঙ্গে যে কোনো ধরনের বাণিজ্য করে এমন দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ বাড়তি শুল্কারোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।

রয়টার্সের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, হোয়াইট হাউজের ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি প্রকাশ করা হয়নি। কোন আইনি ক্ষমতার বলে এই শুল্কারোপ করা হবে কিংবা এটি ইরানের সব বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর প্রযোজ্য হবে কিনা- সে বিষয়েও কিছু জানানো হয়নি। মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউজ কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি