image

ইসলামী বিপ্লবের পর সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ইরান

সরকারিরোধী বিক্ষোভে প্রধান বিরোধী গোষ্ঠীগুলো কারা

বিদেশী সংবাদ মাধ্যম

ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লব হয়। ওই সময় দেশটির শেষ রাজা বা শাহর পতন হয়েছিল। এরপর নিষেধাজ্ঞা, ভূমিকম্প, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাসহ নানান ঘটনায় কেঁপেছিল ইরান। তবে বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে দেশটির শাসকগোষ্ঠী। এই সংকট মোকাবিলায় তারা নজিরবিহীন ব্যবস্থা নিয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা অভিযান চালাচ্ছে এবং প্রায় পুরোপুরিভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে ইরান সরকার। এর আগের কোনো সংকটেই তাদের এমনটা করতে দেখা যায়নি।

বিবিসি পার্সিয়ানকে তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, শুক্রবার ইরানের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। সেদিন অবিশ্বাস্য রকমের ভিড় ছিল, আর ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। কিন্তু শনিবার রাত থেকে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত। একজন ইরানি সাংবাদিকের ভাষায়, এখন রাস্তায় নামা মানে মৃত্যুকে আহ্বান করা। ইরানের এবারের সংকট শুধু দেশের ভেতরের বিক্ষোভেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাইরের চাপও।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বারবার সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। আর এটি তিনি দিচ্ছেন এমন এক সময়ে, যখন মাত্র সাত মাস আগে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে টানা ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। ট্রাম্প বলেছেন, এই পরিস্থিতি ইরানের হাতে আরেকটি তাস তুলে দিয়েছে। অর্থাৎ, ইরান এখন আলোচনার টেবিলে ফিরতে আগ্রহী। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক এবং ‘ইরান’স গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ বইয়ের লেখক ভালি নাসর বলেন, ইরানের শাসকদের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো আগে কঠোরভাবে দমন করে সংকটময় সময়টা কোনোভাবে পার করা। পরিস্থিতি কিছতা স্থিতিশীল হলে তারা ভাববে যে, ভবিষ্যতে তারা কোন পথে এগোবে।

এই সপ্তাহটিই হয়তো ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির গতিপথ ঠিক করে দিতে পারে। এবার আন্দোলন শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে সেই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে, এখন পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক কার্নেগি এনডাউমেন্টের সিনিয়র ফেলো করিম সাজ্জাদপৌর বলেন, একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা পুরোপুরি পতনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এখানে এখনও অনুপস্থিত।

ইতিহাস থেকে দেখা যায়, রাস্তায় যখন মানুষের আবেগ এবং রাষ্ট্রের শক্তি মুখোমুখি হয়, তখন ক্ষমতার ওপরের স্তর থেকেও পরিবর্তন আসতে পারে। আবার পরিবর্তন নিচ থেকে, অর্থাৎ জনগণের চাপেও আসতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের পরিণতি কখনোই নিশ্চিত নয় এবং তা প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এদিকে, ইরানে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। দেশটির ধর্মীয় নেতাদের জন্য এই বিক্ষোভ এখন বড় চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে এই নেতারাই সেখানকার ক্ষমতার মসনদে আছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সম্প্রতি এই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে সরকারবিরোধীরা বলছেন, নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আরও অনেক বেশি এবং এর মধ্যে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী রয়েছেন। তবে আল-জাজিরা কোনো পক্ষের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। একনজরে দেখে নেয়া যাক ইরানের প্রধান বিরোধী গোষ্ঠী কোনগুলোÑ

ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বর্তমান অবস্থা কী : বিক্ষিপ্ত আন্দোলনের মুখে চাপে আছে ইরানের সরকার। কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ইরানের ভেতরে থেকে এই আন্দোলনে যোগ দিলেও অনেকে দেশের বাইরে থেকে শাসকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তারা মূলত নির্বাসিত নেতা অথবা প্রবাসী ইরানি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা ইরানের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নামতে শুরু করেছেন।

বিক্ষোভের কোনো সুনির্দিষ্ট নেতা নেই কেন : অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশীয় রাজনীতির অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানে বর্তমানে এমন কোনো ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দল নেই, যারা সরকার গঠন করতে পারে। ইরানের ভেতরে ও বাইরের বিরোধী গোষ্ঠীগুলো বিচ্ছিন্ন, তাদের লক্ষ্যও ভিন্ন। কারও সুনির্দিষ্ট নেতা আছে, কারও নেই আকবরজাদেহ বলেন, বর্তমান বিক্ষোভ চলাকালে ইরানের ভেতর থেকে কোনো একক নেতা উঠে আসেননি। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, সুনির্দিষ্ট নেতা থাকলে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার ভয়।

২০০৯ সালের জুনে ইরানের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ বা সবুজ আন্দোলন ছিল মূলত পেশাজীবী, নারী অধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলন। দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিজয় ঘোষণার বিরুদ্ধে সেই আন্দোলন হয়েছিল।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী মীর-হোসেইন মুসাভি এই আন্দোলনের প্রতীকী নেতা ছিলেন। তবে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। আরেক সংস্কারপন্থী নেতা মেহেদি কারুবিও গৃহবন্দী ছিলেন, তবে গত বছরের মার্চে তার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। বর্তমান বিক্ষোভে এই দুই নেতার তেমন কোনো প্রভাব নেই। আগে নেতাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের নজির থাকায় বিক্ষোভকারীরা এখন নিজেদের কোনো একক নেতার অধীনে সংগঠিত না করে নেটওয়ার্কভিত্তিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছেন।

ছাত্র সংগঠন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পাড়া-মহল্লার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছোট ছোট অসংখ্য স্থানীয় দল ও নেতা তৈরি হয়েছে। ঠিক যেমনটি দেখা গেছে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনে ও সেপ্টেম্বরে নেপালের তরুণদের বিক্ষোভে।

বিরোধীদের মধ্যে কোন কোন গোষ্ঠী রয়েছে; ইরানের ভেতরে বর্তমানে চলমান সুসংগঠিত গণআন্দোলন ছাড়াও দেশ-বিদেশে বেশ কিছু শক্তিশালী বিরোধী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তাদের সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

রেজা পাহলভি ও রাজতন্ত্রপন্থীরা: ৬৫ বছর বয়সী রেজা পাহলভি ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে ও সাবেক পাহলভি রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকারী। ১৯৫৩ সালে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাহের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব পর্যন্ত টিকে ছিল।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত পাহলভি ‘ইরান ন্যাশনাল কাউন্সিল’ নামের একটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি সরাসরি রাজতন্ত্র ফেরানোর কথা না বলে একটি গণভোটের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন। তবে প্রজাতন্ত্রপন্থী ও বামপন্থীদের তীব্র বিরোধিতার কারণে এই ধারাটি বিভক্ত। প্রবাসীদের মধ্যে পাহলভির জনপ্রিয়তা থাকলেও ইরানের অভ্যন্তরে তার সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

মরিয়ম রাজাভি ও পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন: মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন ছিল একটি শক্তিশালী বামপন্থী গোষ্ঠী। সত্তরের দশকে এটি শাহ সরকারের বিরুদ্ধে বেশ সক্রিয় ছিল। তবে ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরাকের পক্ষ নেওয়ায় ও সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন করায় অনেক ইরানি তাদের ঘৃণা করেন।

২০০২ সালে এরাই প্রথম ইরানের গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির তথ্য ফাঁস করেছিল। দলটির নেতা মাসুদ রাজাভি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে জনসমক্ষে নেই। বর্তমানে তার স্ত্রী মরিয়ম রাজাভি দলটির হাল ধরেছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই দলটির বিরুদ্ধে অন্ধ আনুগত্যের নীতি মেনে চলা ও অনুসারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। তবে বর্তমানে ইরানের অভ্যন্তরে দলটির সক্রিয় উপস্থিতি তেমন একটা নেই।

২০২৩ সালে বেশ কিছু নির্বাসিত দল মিলে এই রাজনৈতিক জোট গঠন করে। ২০২২ সালে বাধ্যতামূলক হিজাব না পরার অভিযোগে ইরানের ‘নীতি’ পুলিশ মাসা আমিনি নামের এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছিল। পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যু হলে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। ওই সময় প্রবাসীদের মধ্যে জোটটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। তারা ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথককরণ, স্বচ্ছ নির্বাচন ও স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে কথা বলে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই জোটের তেমন কোনো জোরালো প্রভাব নেই।

কুর্দি ও বালুচ সংখ্যালঘু গোষ্ঠী: ইরানের প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে ১০ শতাংশ কুর্দি ও ২ শতাংশ বালুচ। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানে এই সুন্নি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই তেহরান সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। পশ্চিম ইরানে কুর্দিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। দীর্ঘকাল ধরে বেশ কিছু কুর্দিগোষ্ঠী সেখানে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সরকারের বিরোধিতা করে আসছে এবং মাঝেমধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। পাকিস্তানের সীমান্ত–সংলগ্ন সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে সুন্নি নেতারা আরও জোরালো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দাবি করছেন। সেখানে তেহরানবিরোধী কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতিও রয়েছে। ইরানের বড় যেকোনো গণআন্দোলনে কুর্দি ও বালুচ এলাকাগুলো সব সময়ই সবচেয়ে বেশি উত্তাল থাকে।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি