image
ইরানের রাজধানী তেহরানে সরকার সমর্থিত জনতার সমাবেশ

ইরানে বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৪২৮

সংবাদ ডেস্ক

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ৩১টি প্রদেশের ১৯০টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

বিক্ষোভকারীদের আর মৃত্যুদণ্ড দেবে না ইরান

৫ ঘণ্টা পর ইরানে বিমান চলাচল শুরু

নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এ পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৪২৮ জন নিহত হয়েছে। বিক্ষোভের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর)’ গতকাল বুধবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, শত শত বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অস্থিরতা ও সহিংস বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর প্রথম বিক্ষোভকারী হিসেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এরফান সোলতানির দণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছে দেশটি। আর কোনো বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেবে না বলে জানিয়েছে ইরান। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ রাখার পর সব ফ্লাইটের জন্য নিজেদের আকাশসীমা আবার খুলে দিয়েছে ইরান।

মুদ্রার মানের আকস্মিক পতনের পর গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে এ বিক্ষোভ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রূপ নেয়। ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে ইরানে। মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক দুরবস্থার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ নেয়।

ইরানে বিক্ষোভে কত লোক নিহত হয়েছে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় নিহত ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ৮ থেকে ১২ জানুয়ারির মধ্যে অন্তত ৩ হাজার ৩৭৯ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার তথ্য নিবন্ধিত হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশই ৩০ বছরের কম বয়সী। তাদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও সিবিএস নিউজের মতো কিছু সংবাদমাধ্যম দাবি করছে, নিহত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে, তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এসব তথ্যের নিরপেক্ষতা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর মেশিনগান ব্যবহার করছে। রাজপথে আহত অবস্থায় পড়ে থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে কাছ থেকে গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। রাশত শহরের এক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, নিরাপত্তা বাহিনী একদল তরুণ বিক্ষোভকারীকে ঘিরে ফেলার পর তারা আত্মসমর্পণের জন্য হাত তোলেন। এরপরও তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

কারাজ শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মরদেহের সঙ্গে সেলফি তুলছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে অঘোষিত সামরিক আইন জারি করা হয়েছে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরপাকড় চালানো হচ্ছে।

আইএইচআরের পরিচালক মাহমুদ আমিরি মোগাদ্দাম বলেন, ১৯৮০-এর দশকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ইরানের শাসকরা যে ধরনের অপরাধ করেছিলেন, বর্তমানে আবার সেই একই পথে হাঁটছে তারা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনই পদক্ষেপ না নিলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটবে।

নেটব্লকস জানিয়েছে, গত ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানে ৯৯ শতাংশ ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বর্হিবিশ্ব থেকে ইরান কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং দমন-পীড়নের সঠিক চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত

ইরানে চলমান অস্থিরতা ও সহিংস বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর প্রথম বিক্ষোভকারী হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত এরফান সোলতানির দণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছে দেশটি। বিষয়টি তার পরিবারকেও জানানো হয়েছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, ২৬ বছর বয়সী পোশাক দোকানের কর্মচারী এরফানকে গত ৮ জানুয়ারি তেহরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কারাজে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা ছিল। গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে এরফানের পরিবার তার অবস্থা সম্পর্কে খুব কমই জানতে পেরেছিল। শুধু মৃত্যুদণ্ডের আগে শেষবিদায় হিসেবে সংক্ষিপ্ত একটি সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়েছিল।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এরফান ও গ্রেপ্তারকৃত অন্যান্য বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ করার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ ‘ভিন্নমত দমন ও আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য আবারও দ্রুত বিচার এবং যথেচ্ছ মৃত্যুদণ্ডের আশ্রয় নিতে পারে’।

তবে বৃহস্পতিবার, (১৫ জানুয়ারী ২০২৬) মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা পর কারাগার কর্তৃপক্ষ এরফানের পরিবারকে ফোন করে জানায় যে এটি স্থগিত করা হয়েছে; যদিও এর কোনো বিস্তারিত কারণ জানানো হয়নি।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, ইরান প্রায়ই কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের দণ্ডাদেশ দিয়ে থাকে। এরফানকে গ্রেপ্তার করার মাত্র দুই দিন পরই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, যা ইরানি মানবাধিকারকর্মীদের মতে তাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করার শামিল।

বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেবে না ইরান

এদিকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ হয়েছে- এমন আশ্বাস পেয়েছেন তিনি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তেহরানের পক্ষ থেকে (বিক্ষোভকারীদের) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করা হয়েছে বলে তাকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পরিকল্পনাও স্থগিত করা হয়েছে। ইরান ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে কাতারের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে কিছু সেনা সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর কয়েক ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প এসব কথা বলেন।

৫ ঘণ্টা বন্ধ রাখার পর নিজেদের আকাশসীমা খুলে দিল ইরান

প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ রাখার পর সব ফ্লাইটের জন্য নিজেদের আকাশসীমা আবার খুলে দিয়েছে ইরান। গতকাল বুধবার রাতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর আগে ওই দিন বিকেলে এক জরুরি নোটিশে আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়ার কথা জানিয়েছিল তেহরান। ইরানের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থার ফ্লাইট বাতিল, রুট পরিবর্তন ও সময়সূচিতে বিপর্যয় ঘটে।

মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে (যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময়) ইরান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। ওই সময় জানানো হয়েছিল, বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ছাড়া অন্য কোনো উড়োজাহাজ ইরানের ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় ইরান এ পদক্ষেপ নিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে এয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগো ও লুফথানসার মতো এয়ারলাইন্সগুলো ইরানের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার ঘোষণা দেয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন ‘নিয়ন্ত্রণে’। তবে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী সহিংস বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ওপর কোনো হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদেশগুলোয় থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় পাল্টা আঘাত হানবে তেহরান। এ হুমকির পর মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ঘাঁটি থেকে নিজেদের কর্মীদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে ওয়াশিংটন।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি