ডনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের শুরুতে দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর থেকে এক বছরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থাকে কার্যত তছনছ করে দিয়েছেন তিনি।
মিনেসোটায় সেনা মোতায়েনের হুমকি ট্রাম্পের
ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি নিয়ে রিপাবলিকানরাই বিভক্ত: জরিপ
তার নেয়া একের পর এক আগ্রাসী পদক্ষেপ বিশ্বরাজনীতিকে এমন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হতে হতে বিশ্ব হয়তো সম্পূর্ণ অচেনা এক রূপ ধারণ করবে। এএফপি’র এক প্রতিবেদনে এমন অভিমত দেয়া হয়েছে।
মিনিয়াপোলিসে কয়েকদিন ধরে চলা ব্যাপক বিক্ষোভ মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিদ্রোহ দমনের আইনে মিনেসোটায় সামরিক বাহিনী মোতায়েনের হুমকি দিয়েছেন। সপ্তাহখানেক আগে গাড়ির ভেতর থাকা মার্কিন নাগরিক রেনে গুড এক অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার (আইসিই) এজেন্টের গুলিতে নিহত হওয়ার পর মিনিয়াপোলিসে বাসিন্দাদের সঙ্গে ফেডারেল কর্মকর্তাদের মুখোমুখি অবস্থান ক্রমশ উত্তেজনাকর রূপ নিয়েছে।
ট্রাম্পের কট্টর অভিবাসন নীতি ও ধরপাকড় অভিযান নিয়ে খোদ তার নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই বিভক্তি দেখা দিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ইপসোসের যৌথ জনমত জরিপে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। এই জরিপে ১ হাজার ২১৭ জন মার্কিন নাগরিক অংশ নিয়েছেন।
ট্রাম্প বিশ্বব্যবস্থা ওলট-পালট করে দিয়েছেন বলে এএফপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আগামী জুনে ৮০ বছরে পদার্পণ করতে যাওয়া এই রিপাবলিকান নেতা নতুন বছরের শুরু থেকেই যুদ্ধাংদেহী মনোভাবে অবতীর্ণ হয়েছেন। গত ৩ জানুয়ারি তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলায় তার নির্দেশে সামরিক অভিযান চালানো হয়। এতে শতাধিক মানুষ নিহত হন। দেশটির বামপন্থি প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শত্রু নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন বিশেষ বাহিনী।
ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর থেকে শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি আবারও ন্যাটোর সদস্যদেশ ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখল করার দাবি তুলেছেন। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কড়াকড়ি শুরু হলে সেখানেও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমনকি প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো ও কলম্বিয়াতেও সামরিক হস্তক্ষেপের চিন্তা করছেন বলে মাঝেমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র রূপকল্প বাস্তবায়নে রাষ্ট্র পরিচালনার চিরাচরিত পদ্ধতিগুলো ভেঙে ‘একলা চলো’ নীতি গ্রহণ করেছেন। এই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ জাতিসংঘের সংস্থাসহ ডজনখানেক আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্পের এ পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেছেন, অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন শুধু বিশ্বায়নবাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। শুধু দেশের বাইরে নয়, ভেতরেও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। তার প্রশাসন সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মিনিয়াপোলিসে অভিবাসনবিরোধী অভিযান চালায়। সেখানে এক অভিবাসন কর্মকর্তা রেনি গুড (৩৭) নামের এক নারীকে গুলি করে হত্যা করেন। এ ঘটনায় ট্রাম্প কিংবা তার প্রশাসন লোক দেখানো সহানুভূতিও দেখায়নি, উল্টো দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ট্রাম্পের মূল পার্থক্য হলো, তিনি কোনো আদর্শ বা গণতন্ত্র রক্ষার ভানটুকুও করেন না।
হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এবং ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতির রূপকার স্টিফেন মিলার সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাস্তব পৃথিবী চলে শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে। এখন আর আন্তর্জাতিক সৌজন্য দেখানোর সময় নেই।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ট্রাম্পের মূল পার্থক্য হলো, তিনি কোনো আদর্শ বা গণতন্ত্র রক্ষার ভানটুকুও করেন না, যেমন ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফেরানোর চেয়ে দেশটির তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তিনি। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতি ‘নব্য উপনিবেশবাদ’ ও ‘সাম্রাজ্যবাদের’ নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের তৈরি আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো নিজেই ভেঙে ফেলছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞ মেলানি সিসন মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সেই চেনা বিশ্বব্যবস্থা আর ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। ট্রাম্প বিশ্বরাজনীতিতে যে পরিবর্তন আনছেন, তা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং অন্য শক্তিগুলোও এখন শুধু নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যস্ত থাকবে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্রদেশের কূটনীতিকের মতে, বিশ্বব্যবস্থা যে আগে থেকেই ভেঙে পড়েছিল, ট্রাম্প সেটাই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন মাত্র।
মিনেসোটায় সেনা মোতায়েনের হুমকি ট্রাম্পের
মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসন কর্মকর্তার উপস্থিতি নিয়ে কয়েকদিন ধরে চলা ব্যাপক বিক্ষোভ মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিদ্রোহ দমনের আইনে মিনেসোটায় সামরিক বাহিনী মোতায়েনের হুমকি দিয়েছেন। সপ্তাহখানেক আগে গাড়ির ভেতর থাকা মার্কিন নাগরিক রেনে গুড এক অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার (আইসিই) এজেন্টের গুলিতে নিহত হওয়ার পর মিনিয়াপোলিসে বাসিন্দাদের সঙ্গে ফেডারেল কর্মকর্তাদের মুখোমুখি অবস্থান ক্রমশ উত্তেজনাকর রূপ নিচ্ছে; গুডের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ পরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের হুমকির কয়েক ঘণ্টা আগেই মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে এক ভেনেজুয়েলান আহত হন। এজেন্টরা ওই ব্যক্তির গাড়ি থামাতে চাইলে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন, বলছে সরকার। গুলি ওই ব্যক্তির পায়ে লেগেছে।
‘যদি মিনেসোটার দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকরা আইন না মানে এবং নিজেদের কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করা আইসিই’র দেশপ্রেমিকদের ওপর পেশাদার উসকানিদাতা ও বিদ্রোহীদের হামলা না থামায় তাহলে আমি ইনসারেকশন অ্যাক্ট চালু করবো,’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন ট্রাম্প।
রিপাবলিকান ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মিনেসোটা রাজ্যের ডেমোক্র্যাট নেতাদের হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছেন। সেখানকার সোমালি বংশোদ্ভূতদের ‘আবর্জনা’ আখ্যা দিয়ে তাদের দেশ থেকে ‘বের করে দেয়া উচিত’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মার্কিন এ প্রেসিডেন্ট এরই মধ্যে প্রায় তিন হাজার ফেডারেল কর্মকর্তা মিনিয়াপোলিসে পাঠিয়েছেন, যারা শহরের বরফে ঢাকা রাস্তায় সামরিক স্টাইলের পোশাক এবং মুখ ঢেকে রাখার মাস্ক পরে, অস্ত্র হাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তবে দিন-রাত সবসময় তাদেরকে ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের বিক্ষোভের মুখেও পড়তে হচ্ছে, যাদের অনেকে শিষ দিয়ে, টাম্বুরিন বাজিয়ে তাদের প্রতিবাদের জানান দিচ্ছেন।
ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি, রিপাবলিকানরাই বিভক্ত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর অভিবাসন নীতি ও ধরপাকড় অভিযান নিয়ে খোদ তার নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই বিভক্তি দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানে এক নারী নিহতের ঘটনা এবং নিয়মিত সহিংসতার জেরে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ইপসোসের যৌথ জনমত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। এই জরিপে ১ হাজার ২১৭ জন মার্কিন নাগরিক অংশ নিয়েছেন।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থক হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশই এখন অভিবাসন কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে আছেন। বিশেষ করে মিনিয়াপোলিসে রেনি নিকোল গুড (৩৭) নামের এক নারী নিহতের ঘটনায় খোদ ট্রাম্পশিবিরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারী রিপাবলিকানদের ৫৯ শতাংশ মনে করেন, গ্রেপ্তার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে কর্মকর্তাদের বল প্রয়োগ করা উচিত। তবে ৩৯ শতাংশ রিপাবলিকান ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, কর্মকর্তাদের উচিত মানুষের জীবন ও শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি কমানো। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা এ বিষয়ে প্রায় এককাট্টা। দলটির ৯৬ শতাংশ সমর্থকই যে কোনো ধরনের সহিংসতা এড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।