ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ-সহিংসতায় অন্তত পাঁচ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে, যাদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় পাঁচশ’ সদস্য রয়েছে।
‘হাজার হাজার মৃত্যুর’ পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল: খামেনির অভিযোগ
ইরানে নতুন নেতৃত্বের ডাক দিলেন ট্রাম্প
দেশটির কর্তৃপক্ষ মৃতের এ সংখ্যা যাছাই করেছে বলে সেখানকার এক কর্মকর্তার বরাতে খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ওই কর্মকর্তা ‘নিরীহ’ ইরানিদের প্রাণহানির জন্য ‘সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ এবং সর্বাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। এ অঞ্চলটিতে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সক্রিয়; অতীতে বিভিন্ন অস্থিরতার সময়েও সেখানকার সহিংসতা ছিল সবচেয়ে তীব্র। তিনি রোববার, (১৮ জানুয়ারী ২০২৬) বলেন, ‘চূড়ান্ত মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। সড়কে নামা বিক্ষোভকারীদের সমর্থন ও অস্ত্র সরবরাহ করেছে ইসরায়েল এবং বিদেশে অবস্থানরত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।’
রয়টার্স লিখেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য নিয়মিতই বিদেশি শত্রুদের দায়ী করে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল। এ ঘোর শত্রু গত জুন মাসে ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ গতকাল শনিবার জানিয়েছিল, নিহতের সংখ্যা ৩,৩০৮ জনে পৌঁছেছে এবং আরও ৪,৩৮২টি ঘটনা পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা ২৪ হাজারের বেশি গ্রেপ্তারের ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে।
নরওয়েভিত্তিক ইরানি কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানিয়েছে, গত ডিসেম্বরের শেষদিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ চলাকালে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষগুলোর কিছু ঘটেছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি এলাকাগুলোতে।
বিবিসি লিখেছে, ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়নের ক্ষোভ থেকে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশটিতে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসন অবসানের দাবিতে রূপ নেয়।
‘হাজার হাজার মৃত্যুর’ পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল: খামেনির অভিযোগ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ মানুষের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত অপশক্তি দায়ী। গতকাল শনিবার খামেনি বলেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এই বিক্ষোভের সময় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছেন এবং কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন।’ তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে একজন ‘অপরাধী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ‘এবারের ইরানবিরোধী ষড়যন্ত্র ছিল আলাদা। কারণ, এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজে ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত ছিলেন।’
ইরানের কর্তৃপক্ষ ক্রমাগত এই অস্থিরতার জন্য তাদের চিরশত্রু মূলত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে। তাদের দাবি, বিদেশি শক্তিগুলো দেশটিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে এবং মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলায় ইন্ধন জুগিয়েছে।
খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান দেশের বাইরে যুদ্ধ টেনে নেবে না। তবে এই মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ছাড় দেয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশকে যুদ্ধে জড়াবো না, কিন্তু দেশি বা আন্তর্জাতিক অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে ছাড়ব না।’
খামেনির অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এরমধ্যে ২৫০টির বেশি মসজিদ এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বিক্ষোভের ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কষ্টের কারণে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, যা শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল। সরকার প্রথমে সাধারণ মানুষের দাবি ও কষ্টের কথা স্বীকার করে নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনকে ‘হাইজ্যাক’ বা দখল করে নেয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে ইরান সরকার। তাদের দাবি, বিক্ষোভকারীরা বিদেশি শক্তির নির্দেশে সহিংস হয়ে ওঠে। খামেনির মতে, ট্রাম্প ছিলেন এই পুরো ষড়যন্ত্রের মূল কেন্দ্রে।
ইরানে নতুন নেতৃত্বের ডাক দিলেন ট্রাম্প
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশব্যাপী চলা বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শনিবার পলিটিকোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এখন ইরানে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে।’ ট্রাম্পের এ মন্তব্যের বিষয়ে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
খামেনির তীব্র সমালোচনা করে ট্রাম্প তাকে একজন ‘অসুস্থ ব্যক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘তার (খামেনি) উচিত দেশ সঠিকভাবে পরিচালনা করা ও মানুষ হত্যা বন্ধ করা। দুর্বল নেতৃত্বের কারণে ইরান এখন বিশ্বের সবচেয়ে বসবাসের অযোগ্য স্থানে পরিণত হয়েছে।’ জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী মিশনের মুখপাত্র ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত বুধবার এক মার্কিন কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা জোরদার এবং ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা মোকাবিলায় অতিরিক্ত সেনা ও সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। এরমধ্যে রয়েছে ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, অতিরিক্ত বিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এদিকে গত বুধবার এক মার্কিন কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা জোরদার এবং ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা মোকাবিলায় অতিরিক্ত সেনা ও সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। এরমধ্যে রয়েছে ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, অতিরিক্ত বিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইরানে সামরিক হামলার সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে ওই দিনই মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি থেকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।