নতি স্বীকারে নারাজ ইউরোপের নেতারা
যুক্তরাজ্য, নরওয়ে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ছয় সদস্যরাষ্ট্রসহ ইউরোপের মোট আটটি দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই পদক্ষেপ গত গ্রীষ্মে দেশগুলোর সঙ্গে করা চুক্তিগুলোকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দুটি বৃহত্তম রাজনৈতিক জোট—ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি (ইপিপি) এবং সোশ্যালিস্ট অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস (এসঅ্যান্ডডিএস) গত শনিবার রাতে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইইউর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা চুক্তি অনুমোদন করা সম্ভব নয়।
ট্রাম্পের শুল্কারোপের ঘোষণা মূলত ইউরোপের বর্তমান বাস্তবতাকে উপেক্ষা করছে। বাস্তবতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের সদস্যদেশগুলোর আলাদা কোনো বাণিজ্য চুক্তি নেই। ইইউর যাবতীয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয়। গত জুলাইয়ে ট্রাম্পের চাপের মুখে ইইউ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছিল। চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর হয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তা আইনিভাবে অনুমোদিত হয়নি।
গত শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো সব ধরনের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ শুল্ক কার্যকর হবে, যা পরে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে এবং কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক প্রযোজ্য থাকবে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এ অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ তাঁর চাই। তিনি শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের সম্ভাবনাকে বাতিল করেননি। ইপিপি নেতা ম্যানফ্রেড ওয়েবার বলেন, ‘ইপিপি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যচুক্তির পক্ষেই ছিল। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির মুখে এই মুহূর্তে এর অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়।’
বেপরোয়া ট্রাম্প: ট্রাম্পের এই নতুন হুমকিকে দেখা হচ্ছে একজন বেপরোয়া নেতার যুক্তি জয়ের চেষ্টা হিসেবে, যিনি কখনো মিত্র, আবার কখনোবা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। নিজের প্রিয় ‘অস্ত্র’ ব্যবহার করে তিনি একদিকে ইউরোপকে বিভক্ত করতে চাইছেন, অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ইউরোপের বাধাকে গুঁড়িয়ে দিতে চাইছেন।
এই হুমকি ট্রাম্পের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির অস্থিতিশীল চরিত্রকে যেমন ফুটিয়ে তুলেছে, তেমনি ইইউকেও যেন নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাপের মুখে এত দিন অনেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নকে দুর্বল বলে মনে করতেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতকাল রোববার ইইউ রাষ্ট্রদূতদের এক জরুরি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে মার্কিন বাণিজ্যসচিব হাওয়ার্ড লুটনিক সতর্ক করেছিলেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি তাদের প্রযুক্তি আইন থেকে সরে না আসে, তবে ইস্পাতের ওপর শুল্ক কমানোর কোনো সুযোগ নেই। অথচ সস্তা চীনা পণ্য আমদানির বিরুদ্ধে লড়াই করতে একটি জোট গঠনের ক্ষেত্রে ইউরোপ ও আমেরিকা—উভয় পক্ষেরই অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।
প্রযুক্তি আইনের সঙ্গে বাণিজ্য শুল্ককে জড়িয়ে ফেলার যেকোনো চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিশেষ করে ইলন মাস্কের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এর ওপর আরোপিত ১২ কোটি ইউরো জরিমানা পুনর্বিবেচনার বিষয়ে তারা অনড়।
এদিকে,ইউরোপের আট দেশের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘ইউরোপ কখনো জিম্মি হবে না।’ মেটে ফ্রেডেরিকসেনের পাশাপাশি শুল্কারোপের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইউরোপের অন্যান্য দেশের নেতারাও। গত শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইউরোপের আটটি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো সব ধরনের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দেন। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ শুল্ক কার্যকর হবে, যা পরে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে এবং কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক প্রযোজ্য থাকবে।
এই আট দেশ হলো যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড। এসব দেশ ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণার বিরোধিতা করেছিল। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ তাঁর চাই। তিনি শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের সম্ভাবনাকে বাতিল করেননি।
ট্রাম্পের এমন পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা চলছে ইউরোপজুড়ে। ইউরোপীয় নেতারা একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে শুল্কারোপের নিন্দা জানিয়েছেন। পৃথকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, ‘আমরা সহযোগিতা করতে চাই, সংঘাত চাই না। মহাদেশের বাকি অংশ থেকেও ধারাবাহিকভাবে বার্তা পেয়ে আমি খুশি—ইউরোপ জিম্মি হবে না।’
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এটা আরও গুরুত্বপূর্ণ, আমরা ইউরোপীয় সম্প্রদায়ের সৃষ্টিকারী মৌলিক মূল্যবোধের ওপর দৃঢ?ভাবে দাঁড়িয়ে আছি।’ এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, গতকাল রোববার তিনি ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন এবং পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এরপর তিনি ট্রাম্পের সঙ্গেও ফোনালাপ করেন।
স্টারমারের দপ্তরের একজন মুখপাত্র জানান, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার ভার ন্যাটোর দেশগুলোর সম্মিলিত অগ্রাধিকার। তিনি আরও বলেছেন, ন্যাটোর সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিতে মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপ করাটা ভুল পদক্ষেপ।
এদিকে, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে আটটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর ইউরোপের নেতারা নড়েচড়ে বসেছেন। তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নতি স্বীকার করতে নারাজ। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেশগুলোর সম্পর্ক খারাপ হতে পারে বলেও তারা সতর্কতা দিয়েছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে একটি যৌথ বিবৃতি এসেছে ইউরোপীয় নেতাদের কাছ থেকে। তাতে নেতারা মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে শিগগির সংলাপে বসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখ-তার নীতির প্রশ্নে তারা ঐক্যবদ্ধ। গতকাল রোববার ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। এদিকে ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। মার্কিন শুল্ক নিয়ে সংকটের সমাধান পেতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা জরুরি বৈঠকে বসছেন।
এ ছাড়া ট্রাম্প এই সপ্তাহের শেষের দিকে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যোগ দেবেন। এতে ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের নেতারাও থাকবেন। এ ছাড়া কানাডা, স্পেন ও বেলজিয়ামের মতো ন্যাটো সদস্যরা এই ফোরামে অংশ নেবেন। এই সম্মেলনে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ ইউরোপকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ শত্রুতে পরিণত হওয়ার ঘটনায় নেতারা হতবাক হয়ে গেছেন। গত শনিবার ট্রাম্প ইউরোপের আটটি দেশের বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক ঘোষণা করেন। তিনি ঘোষণায় বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য চুক্তি করতে হবে, নয়তো শুল্ক দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। পরে জুনে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। শুল্ক আরোপের শিকার আটটি দেশ হলো– ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বলপ্রয়োগের কৌশল ছাড়া ট্রাম্পকে সহজে হটানো সম্ভব নয়। তবে এটি করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আরও ভারী মূল্য দিতে হতে পারে। কারণ, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোকে শক্তিশালী করতে এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ইউরোপের দেশগুলো। লন্ডনের চ্যাথাম হাউস থিঙ্কট্যাঙ্কের পরিচালক ব্রোনওয়েন ম্যাডক্স সোমবার, (১৯ জানুয়ারী ২০২৬) একটি টেক্সট বার্তায় বলেছেন, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে উত্তেজিত না করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের পদক্ষেপ তাদের নীতি ও স্বার্থের বিরুদ্ধে এতটাই অপরাধজনক কাজ যে, ইউরোপ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমেও পাল্টা আঘাত হানতে পারে।
ইইউর শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস শনিবার বলেন, ডেনমার্কের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি সার্বভৌম অঞ্চল দখলের হুমকি মূলত ন্যাটো প্রতিরক্ষা জোট ভেঙে ফেলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, যা পশ্চিমা বিশ্বকে বিভক্ত করবে। তা ছাড়া ট্রাম্পের এই কর্মকা- মস্কো ও বেইজিংকে উৎসাহিত করবে।
আট দেশের যৌথ বিবৃতি: ট্রাম্পের শুল্ক হুমকিতে থাকা আট দেশ গতকাল রোববার যৌথ বিৃবতিতে জানিয়েছে, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে তারা ঐক্যবদ্ধ। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখ-তার নীতির ওপর ভিত্তি করে সংলাপে অংশ নিতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হুমকি ট্রান্সআটলান্টিক (আটলান্টিকের দুই পারের দেশগুলো) সম্পর্ককে দুর্বল করবে এবং খারাপ সম্পর্কের বিপজ্জনক ঝুঁকি তৈরি করবে।
কোন দেশের কী বক্তব্য: বিবিসি জানায়, ট্রাম্পের শুল্কারোপের বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন। শনিবার এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘আমরা নিজেদের ট্রাম্পের কাছে ব্ল্যাকমেইল হতে দেব না। অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, কোনো ভয় বা হুমকি আমাদের প্রভাবিত করতে পারবে না।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ তাদের জনগণের বিষয়। ন্যাটো মিত্রদের সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপ করা সম্পূর্ণ ভুল। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, শুল্কের হুমকি অগ্রহণযোগ্য। আমরা ভয় বা হুমকিতে নতি স্বীকার করব না। ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জার্মানি।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকেকে রাসমুসেন বলেন, ট্রাম্পের ঘোষণা আমাকে অবাক করেছে। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন বলেন, ট্রাম্পের হুমকিকে আমরা ‘সমগ্র ইইউর সমস্যা’ হিসেবেই দেখছি। আমরা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হবো না। নেদার?ল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ভ্যান উইল বলেন, তাঁর দেশ নতুন শুল্কের বিষয়টি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করবে।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব ট্রাম্পকে বলেন, সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যায়; চাপের মাধ্যমে নয়। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোর বলেন, মিত্রদের হুমকিতে রাখা যায় না।
ট্রাম্পের যুক্তি: ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড দখল না করে, তবে চীন বা রাশিয়া ভূখ-টি দখল করবে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মস্কো বা বেইজিংয়ের এ অঞ্চল দখলের পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিত নেই। ওয়াশিংটনের এই অঞ্চলে সৈন্য উপস্থিতি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কোনো বাধা নেই। ৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ড শতাব্দী ধরে ডেনমার্ক রাজ্যের অংশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ভূখ-টি আরও স্বায়ত্তশাসন অর্জন করেছে। মতামত জরিপগুলোতে দেখা যায়, গ্রিনল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দা ওয়াশিংটনের কর্তৃত্বে যাওয়ার বিরোধিতা করে।
এর আগেও আর্কটিক অঞ্চলকে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার সামুদ্রিক করিডর। যেটিকে বলা হয় ‘জিআইইউকে’। এই ভৌগলিক অবস্থান, ৮ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের গ্রিনল্যান্ড দ্বীপকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এছাড়া গ্রিনল্যান্ডে তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজসহ (রেয়ার আর্থ মিনারেলস) বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ভা-ার আছে। ট্রাম্প প্রশাসনের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করতে চাওয়ার পেছনে এটি অন্যতম কারণ। তবে অধিগ্রহণের চেষ্টা শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনই করছে বিষয়টা এমন নয়। দ্বীপটি ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের আগ্রহ উনিশ শতক থেকে। ১৮৬৭ সালে তারা রাশিয়ার কাছে থেকে আলাস্কা কিনে নেয়। তখনও তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ সিউয়ার্ড ডেনমার্কের কাছে থেকে গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ড কেনার ধারণা উত্থাপন করেছিলেন।
যদিও সে প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু এরপরও বিভিন্ন সময় দ্বীপটির ওপর ওয়াশিংটনের নজর থাকার তথ্য সামনে এসেছে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ফিলিপাইনসের একটি ভূখণ্ড (যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন) ডেনমার্ককে দেওয়ার বিষয়েও একবার আলোচনা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল। যুদ্ধ শেষে ১৯৪৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান দ্বীপটি কেনার জন্য ডেনমার্ককে ১০ কোটি ডলার দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডেনমার্ক সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
১৮৬৭: আলাস্কা বিক্রি ও আর্কটিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের প্রশাসন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছে থেকে ৭২ লাখ ডলারে আলাস্কা কিনে নেয়। এরপর জনসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিউয়ার্ড আর্কটিক অঞ্চলের অন্যান্য ভূখ-ের দিকেও নজর দেন।
সিউয়ার্ডের অনুরোধে সাবেক অর্থমন্ত্রী রবার্ট জে ওয়াকার যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ভা-ারে গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডকে যুক্ত করার সুপারিশ করেন। এর কারণ হিসেবে তখন একটি প্রতিবেদনে তিনি লিখেছিলেন, রাজনীতি ও বাণিজ্যের কথা। এছাড়া, গ্রিনল্যান্ডের বিশাল ভূপ্রকৃতি ও খনিজ সম্পদের কথাও গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেন। আরও লিখেন, গ্রিনল্যান্ডের শিলা ও ভূতত্ত্বে বিপুল খনিজ সম্পদ থাকতে পারে। জে ওয়াকারের যুক্তি ছিল, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।কিন্তু তখন ডেনমার্কের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়নি।
১৯১০: একটি দুঃসাহসিক প্রস্তাব: সে সময় ফিলিপাইনসের মিনদানাও দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে ছিল। ডেনমার্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিস ফ্রান্সিস ইগান এই দ্বীপের বিনিময়ে গ্রিনল্যান্ড নেওয়ার প্রস্তাব সংক্রান্ত একটি চিঠি লিখেছিলেন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। ইগানের ভাষায়, সেটি ছিল একটি দুঃসাহসিক প্রস্তাব। প্রস্তাবটি নিয়ে তখন আলোচনা বেশি দূর আগায়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আভাস স্পষ্ট হয়ে ওঠায় যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায়। তবে কয়েক বছর পর দ্বীপগুলো জার্মানির নিয়ন্ত্রণে যাওয়া ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের কাছে থেকে ড্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ (বর্তমান ভার্জিন আইল্যান্ডস) ২৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয়।
১৯৪৬: ১০ কোটি ডলারের প্রস্তাব: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি ডেনমার্ক দখল করে। তখন গ্রিনল্যান্ডে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়। বেশ কয়েক বছর পর প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো ডেনমার্কের কাছে গ্রিনল্যান্ড কেনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। সে সময় প্রস্তাবটি গোপন রাখা হলেও সামনে আসে ১৯৯১ সালে। পরে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি ড্যানিশ পত্রিকা। বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ ও কৌশল কমিটির একটি বৈঠকে সবাই গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়ে একমত হন। মে মাসে পররাষ্ট্র দপ্তরের উত্তর ইউরোপ বিভাগের সহকারী প্রধান উইলিয়াম সি ট্রিম্বল দ্বীপটির মূল্য নির্ধারণ করেন। প্রস্তাব দেন, গ্রিনল্যান্ডের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্ককে ১০ কোটি ডলার মূল্যের স্বর্ণ দেবে। উইলিয়াম ট্রিম্বল তখন যুক্তি দিয়েছিলেন, গ্রিনল্যান্ড কিনতে পারলে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি স্থাপন করা যাবে। আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে কেউ আক্রমণ করলে ওই ঘাঁটি থেকে তা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
১৯৪৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বায়র্নস নিউইয়র্কে সফররত ড্যানিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুস্তাভ রাসমুসেনের কাছে প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন। কিন্তু ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ড বিক্রি করতে রাজি হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও পরিচালনার অনুমতি দেয়। ১৯৭৯ সালে একটি গণভোটের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড স্বশাসন লাভ করে। ফলে ডেনমার্কের কাছে থেকে এর স্বায়ত্তশাসন আরও বৃদ্ধি পায়।