গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক ঠেকাতে তৎপর ইইউ, চলছে পাল্টা ব্যবস্থার প্রস্তুতিও

সংবাদ ডেস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপ থেকে বিরত রাখতে প্রচেষ্টা বাড়ানোর ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতরা। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের শুল্ক বলবৎ হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ারও প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন ইইউ কূটনীতিকরা।

গত শনিবার গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিরোধিতা করা ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের পণ্যে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আলোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড কেনা পর্যন্ত এ শুল্ক থাকবে বলেও তিনি জানান। প্রভাবশালী ইইউ দেশগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ পদক্ষেপকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ আখ্যা দিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপের কী কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার জরুরি সম্মেলনে বসার কথা রয়েছে ইইউ নেতাদের। তাদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ৯ হাজার ৩০০ কোটি ইউরোর পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ, ছয় মাসের স্থগিতাদেশ শেষে যা আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চালু হতে পারে। অন্য যেসব বিকল্পের কথা ভাবা হচ্ছে, তার মধ্যে আছে কখনো কাজে না লাগানো ‘জোর-জবরদস্তিবিরোধী ব্যবস্থা’ বা ‘অ্যান্টি-কোয়েরশন ইন্সট্রুমেন্ট’ (এসিআই) সক্রিয় করা, যা সরকারি দরপত্র, বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার সীমিত করবে কিংবা ডিজিটালসহ সবধরনের সেবাখাতমূলক বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ, যে খাতে ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক লাভ থাকে। তবে প্রাথমিকভাবে এসিআই’র তুলনায় পাল্টা শুল্ক আরোপেই বেশিরভাগ দেশের পক্ষপাত দেখা যাচ্ছে।

ইইউ সম্মেলনগুলোতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করা ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে বলেছেন, ইইউ সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় তারা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে সহায়তা দিতে দৃঢ় অঙ্গীকার এবং যে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে।

গত বুধবার এ সংক্রান্ত বিষয়ে মতবিরোধ নিয়ে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড একটি ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করেছে। সেদিকে ইঙ্গিত করে নরওয়ে সফররত ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকি রাসমুসেন বলেছেন, ডেনমার্ক কূটনীতিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। দিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে কেবল তার প্রেসিডেন্টই থাকেন না। আমি সম্প্রতি সেখানে গিয়েছিলাম। আমেরিকান সমাজে জবাবদিহিতা ও ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারও আছে’।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সংলাপেই যে ইইউ বেশি জোর দিচ্ছে, তার খানিকটা প্রমাণ মিলবে এবারের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামেও। সেখানে আগামীকাল ট্রাম্পের ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে, ছয় বছরের মধ্যে এবারই প্রথম তিনি ওই সম্মেলনে হাজির হচ্ছেন।

‘সব বিকল্প খোলা রয়েছে। দাভোসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পর নেতারা আবার একত্রিত হবেন,’ ইইউ পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ জানিয়ে এমনটাই বললেন ইইউ’র এক কূটনীতিক। যে ৮ দেশের পণ্যের ওপর ট্রাম্প ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন শুল্ক আরোপের কথা বলছেন, তারা আগে থেকেই ১০-১৫ শতাংশ মার্কিন শুল্কের মধ্যে রয়েছে। ডেনমার্কের বিস্তৃত আর্কটিক দ্বীপটি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধের পর এই দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডে সীমিত আকারে সেনাও পাঠিয়েছে।

এক যৌথ বিবৃতিতে গতকাল রোববার দেশগুলো বলেছে, ‘শুল্ক হুমকি আটলান্টিকের এপার-ওপারের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বিপজ্জনক পতনের দিকে ধাবিত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।’

সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড গত অখণ্ডতার নীতির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপে বসতে তারা প্রস্তুত বলেও বিবৃতিতে বলা হয়েছে। মহাদেশের বিভিন্ন অংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘পাশে থাকার’ বার্তায় ‘হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে’ বলে লিখিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ‘ইউরোপকে ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না,’ বলেছেন তিনি।

ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি এরই মধ্যে বিশ্ব বাজারকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে। ডলারের বিপরীতে ইউরো ও স্টার্লিংয়ের দর পড়েছে, সামনে মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়বে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ‘ঝুঁকির মুখে’

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এসিআই চালু করার পক্ষে মত দিচ্ছেন। তবে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকল মার্টিল বলেছেন, ইইউ’র পাল্টা পদক্ষেপ নেয়া উচিত তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু যে ব্যবস্থা আগে কখনো ব্যবহারই হয়নি তা চালু করা ‘খানিকটা অকালপক্কই’ হবে। অন্য ইইউ নেতাদের চেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক তুলনামূলক বেশি ভালো ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি গতকাল রোববার ওয়াশিংটনের শুল্ক হুমকি ‘ভুল পদক্ষেপ’ আখ্যা দিয়েছেন। নিজের ভাবনার কথা ট্রাম্পকে জানিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

নতুন শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন কী করবে, এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিটিশ সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা নন্দী বলেছেন, বিরোধ নিষ্পত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রদের কাজ করা জরুরি।

গতকাল রোববার স্কাই নিউজকে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের অবস্থান হচ্ছে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কোনো দরকষাকষি চলবে না। আমাদের সম্মিলিত স্বার্থ হলো একসঙ্গে কাজ করা এবং কথার লড়াই শুরু হতে না দেয়া’।

ট্রাম্পের এই নতুন শুল্ক হুমকি গত বছর মে ও জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিগুলোকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিস্তুত শুল্ক বহাল রাখছে, অন্যদিকে তাদের অংশীদারদের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করতে হচ্ছে- এমন সামঞ্জস্যহীনতার কারণে সেসব চুক্তি আগে থেকেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে ছিল।

ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের গতিপ্রকৃতি বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ চুক্তি নিয়ে কাজ স্থগিত করার দিকেই এগোচ্ছে। ইইউতে আমদানি হওয়া অনেক পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহার নিয়ে আগামী ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি ওই পার্লামেন্টে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল, ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টির প্রধান মানফ্রেড ভেবার গত শনিবার বলেছেন, এখনই ওই শুল্ক প্রত্যাহার অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

জার্মান ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ইয়ুর্গেন হার্ট খবরের কাগজ বিল্ডকে বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হুঁশে ফেরাতে’ সর্বশেষ আরেকটি পদক্ষেপ নেয়ার কথাও ভাবছেন তারা। সেটি হলো এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল বয়কট করা। যুক্তরাষ্ট্রই চলতি বছর হতে যাওয়া এ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক।

গ্রিনল্যান্ড থেকে ‘রুশ হুমকি’ দূরে সরানো হবে: ট্রাম্প

গ্রিনল্যান্ড থেকে ‘রুশ হুমকি’ দূরে সরাতে ডেনমার্ক কিছুই করতে পারছে না মন্তব্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘এখনই সময়, এটা করে ফেলার। ২০ বছর ধরে ন্যাটো ডেনমার্ককে বলছে তোমাকে রুশ হুমকি গ্রিনল্যান্ড থেকে দূরে সরাতে হবে। ?দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ডেনমার্ক এ বিষয়ে কিছুই করতে পারছে না।’ নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে ট্রাম্প এমনটাই লিখেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তার এ মন্তব্য নিয়ে হোয়াইট হাউস, ডেনমার্কের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ডেনিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। এর মালিকানা ছাড়া অন্য কিছুতে রাজি হবেন না বলে ট্রাম্প বারবারই বলে আসছেন। কিন্তু ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা বলছেন, স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয় এবং এর বাসিন্দারাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হতে চান না।

ইউরোপের দেশগুলোও ডেনমার্কের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প ডেনমার্কসহ ৮ ইউরোপীয় দেশের পণ্যে ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ গ্রিনল্যান্ড কিনতে না পারছে ততক্ষণ এ শুল্ক থাকবে বলেও সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার ভাষ্য, গ্রিনল্যান্ডের আশপাশে চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। এ কারণে দ্বীপটি তাদের দরকার।

অন্যদিকে ডেনিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর সম্মিলিত নিরাপত্তা ছাতার আওতাতেই আছে। প্রয়োজনে সেখানে সৈন্য উপস্থিতি, সামরিক শক্তি বাড়ানো যায়, কিন্তু এটি বিক্রি হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক শক্তির মাধ্যমে বলপ্রয়োগে দ্বীপটি দখলে নেয় তাহলে কার্যত ‘ন্যাটোর অবসান’ হবে বলেও তারা হুঁশিয়ার করেছে।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি