image

বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কেন বিতর্কিত

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

গাজা সংকট সমাধানের নামে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা, সমালোচনা আর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন বৈশ্বিক শান্তি কাঠামো হিসেবে এই বোর্ডকে তুলে ধরা হলেও এর কাঠামো, সদস্যপদ, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে বোর্ডটির নেতৃত্ব ও গঠনতন্ত্র ঘিরে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ট্রাম্প আজীবন এই বোর্ডের সভাপতি থাকবেন। পাশাপাশি নির্বাহী বোর্ডে যুক্ত করা হয়েছে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে, যিনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ সমর্থনের কারণে আজও সমালোচিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে বিতর্কিতদের অন্তর্ভুক্তি বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।

বোর্ডের আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো অর্থনৈতিক কাঠামো। স্থায়ী সদস্য হতে চাইলে এক বিলিয়ন ডলার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। যা গাজার পুনর্গঠনে ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়কে অর্থের সঙ্গে যুক্ত করা এক ধরনের ‘পে-টু-প্লে’ কূটনীতি। যা আন্তর্জাতিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এছাড়া এই বোর্ডকে অনেকেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী কাঠামো হিসেবে দেখছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রমতে, ট্রাম্পের এই উদ্যোগ জাতিসংঘের বিদ্যমান কাঠামো ও নীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফ্টের বিশ্লেষক খালেদ এলগিন্ডির মতে, গাজা দিয়ে শুরু হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ভবিষ্যতে আরও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলকে এই বোর্ডের আওতায় আনা—এমনকি বিদ্যমান জাতিসংঘ ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করাও হতে পারে।

বোর্ডের গঠনে সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি হিসেবে দেখা হচ্ছে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতি। নির্বাহী বোর্ডে কোনো ফিলিস্তিনি সদস্য নেই, অথচ গাজার ভবিষ্যৎ শাসন ও পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এখানেই। ফিলিস্তিনি রাজনীতিক মুস্তাফা বারঘৌতির ভাষায়, এটি মূলত একটি ‘আমেরিকান বোর্ড’, যেখানে আন্তর্জাতিক উপাদান থাকলেও ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ অনুপস্থিত।

ইসরায়েলও এই উদ্যোগে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। দেশটির সরকার বলছে, বোর্ড গঠনের বিষয়ে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। বিরোধীদল একে কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে, আর কট্টর ডানপন্থীরা গাজার পুনর্গঠনের ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করছে।

গাজায় যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত ও যুদ্ধবিরতি এখনো অনিশ্চিত, সেখানে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রবল। শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে এই বোর্ড নতুন করে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে উঠবে কি না—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে।

তারপরও যুক্ত হচ্ছে সাত দেশ

তবে এত বিতর্ক আর প্রশ্নবোধক চিহ্নের মধ্যেও ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসে যুক্ত হচ্ছে আরও সাত দেশ। এই তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও কাতার। বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে মুসলিমপ্রধান এসব দেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি এ খবরটি জানিয়েছে।

ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এই বোর্ডে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন। তবে রাশিয়া জানিয়েছে, তারা এখনও বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। পুতিন বলেন, এই উদ্যোগ মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ও রাশিয়া এক বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

সৌদি আরবের ভাষ্য হচ্ছে, মুসলিম-প্রধান দেশগুলোর এই জোট গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, পুনর্গঠন ও ন্যায়সঙ্গত শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সমর্থন করছে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে বোর্ডে যোগ দিয়েছে। তবে কানাডা ও যুক্তরাজ্য এখনও সিদ্ধান্ত জানায়নি। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইসরায়েলও এই জোটে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, স্লোভেনিয়া এই উদ্যোগে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি