বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রস্থান শুধু একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের এক ধাক্কা। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক সংস্থাটির সবচেয়ে বড় অর্থদাতা ও প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যে ভূমিকা রেখে এসেছে, তার অনুপস্থিতি বিশ্বজুড়ে রোগ প্রতিরোধ, জরুরি স্বাস্থ্য প্রতিক্রিয়া ও গবেষণা কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংস্থার বাজেট সংকট গভীরতর : যুক্তরাষ্ট্র এতদিন ডব্লিউএইচওর মোট বাজেটের প্রায় ১৮ শতাংশ অর্থ জোগান দিত। এই অর্থ দিয়েই সংস্থাটি টিকাদান কর্মসূচি, সংক্রামক রোগ নজরদারি, জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা এবং দরিদ্র দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চালাত। যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ায় ডব্লিউএইচও ইতোমধ্যে ব্যবস্থাপনা দল অর্ধেকে নামিয়েছে এবং কার্যক্রম সংকুচিত করেছে। চলতি বছরের মাঝামাঝি নাগাদ প্রায় এক-চতুর্থাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থের এই ঘাটতি সবচেয়ে বেশি আঘাত করবে আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোতে, যেখানে ডব্লিউএইচওর সহায়তা ছাড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেকটাই নড়বড়ে।
বৈশ্বিক রোগ নজরদারিতে দুর্বলতা : ডব্লিউএইচও মূলত একটি বৈশ্বিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থার মতো কাজ করে। নতুন ভাইরাস, মহামারি বা স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে দেশগুলোকে প্রস্তুত হতে সহায়তা করে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী দেশের অংশগ্রহণ কমে গেলে এই তথ্যপ্রবাহ দুর্বল হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে নতুন কোনো মহামারি দেখা দিলে বিশ্ব একযোগে প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা কমে যেতে পারে। যার ফল ভোগ করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকেও।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকি : বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডব্লিউএইচও থেকে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে নিজেকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সংস্থাটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতিতে নেতৃত্ব দিত, গবেষণার তথ্য পেত এবং আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণে প্রভাব রাখত। এই প্রভাব হারালে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে একা লড়তে হতে পারে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেলথ ল বিশেষজ্ঞ লরেন্স গোস্টিনের মতে, এটি শুধু আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে সরে যাওয়া নয়, বরং মার্কিন আইনের দৃষ্টিতেও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।
বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় চাপ: ডব্লিউএইচও ছাড়ার সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। যেখানে জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কমিয়ে আনার প্রবণতা স্পষ্ট। এর ফলে বিশ্বে স্বাস্থ্য, জলবায়ু বা মানবিক সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিত কাঠামো আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিকল্প কী: ডব্লিউএইচও এখন ইউরোপীয় দেশ, চীন এবং বেসরকারি দাতাদের ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অর্থের ঘাটতি শুধু টাকা দিয়ে পূরণ করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, গবেষণা ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে আর্থিক ও কাঠামোগত সংকটে ফেললেও এর প্রভাব শুধু ডব্লিউএইচওতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, মহামারি মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এই সিদ্ধান্ত। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি এমন এক সিদ্ধান্ত। যার প্রভাব বিশ্ব যেমন অনুভব করবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র নিজেও এড়িয়ে যেতে পারবে না।