image
ছবিঃ সংগৃহীত

মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে ট্রাম্পের বেশিরভাগ দাবিই মিথ্যা

সংবাদ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর গত মঙ্গলবার পূর্ণ হয়েছে। বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এদিন তিনি গণমাধ্যমে এক দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। এতে তিনি মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে নানা দাবি করেন, যার অধিকাংশই সত্য নয়।

দীর্ঘ এলোমেলো বক্তৃতায় ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে এখন ‘কোনো মূল্যস্ফীতি নেই’। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, চাকরিচ্যুত সরকারি কর্মচারীরা বেসরকারি খাতে সহজে নতুন কাজ পেয়ে গেছেন। তিনি আরও দাবি করেন যে ওষুধের দাম ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

আল-জাজিরা ট্রাম্পের অর্থনীতিসংক্রান্ত এসব দাবির কয়েকটি যাচাই করে দেখেছে। এতে দেখা গেছেÑ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও ওষুধের দামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের বড় ধরনের অমিল রয়েছে।

১. ট্রাম্পের দাবি, তিন মাস ধরে মূল মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে মূল মূল্যস্ফীতি (কোর ইনফ্লেশন) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

এর আগের এক মাসের মূল ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। কারণ, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার অচল হয়ে পড়েছিল। এর আগে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার আর কখনো এত দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়েনি।

অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি গতবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ ট্রাম্পের দাবি বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মিলছে না।

২. ট্রাম্পের দাবি, তার ‘সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ’ কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধের দাম ৩০০, ৪০০, এমনকি ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ওষুধের দাম কমাতেই এ কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১০০ শতাংশের বেশি মূল্যহ্রাস গাণিতিক দিক থেকে অসম্ভব। কোনো পণ্যের দাম ১০০ শতাংশ কমার অর্থ হলো, সেটি বিনা মূল্যে পাওয়া যাবে। এর বেশি কমার অর্থ হলো, ওষুধ কেনার কারণে কোম্পানিগুলোকে উল্টো ভোক্তাকে অর্থ দিতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়।

৩. সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন শুল্ক মামলার রায় নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য আংশিক সঠিক, তবে স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প বক্তৃতায় সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন এমন একটি মামলার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট (আইইইপিএ) ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের ওপর তার প্রশাসনের শুল্ক আরোপের বিষয়টি আইনগতভাবে সঠিক কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

ট্রাম্প দাবি করেন, আদালত তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে রায় দিলে শুল্ক হিসেবে সংগ্রহ করা অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে। ট্রাম্পের এ দাবি আংশিকভাবে ঠিক। তবে তার এ বক্তব্য স্পষ্ট নয়। কারণ, আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের বিপক্ষে রায় দিলে পুরো নয়, বরং আমদানিকারকদের দেয়া শুল্কের কিছু অংশ ফেরত দিতে হবে। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, সরকারকে সংগৃহীত শুল্কের অর্ধেকের মতো ফেরত দিতে হতে পারে।

হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কেভিন হ্যাসেট বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট বর্তমান পরিকল্পনা বাতিল করে দিলে প্রশাসন শুল্ক আরোপের জন্য বিকল্প আইনি পথ খুঁজে নেবে।

৪. ট্রাম্পের দাবি, সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেন ‘শুল্ক আরোপ করেননি’। তার এ দাবি সম্পূর্ণ ভুল। বাইডেন প্রশাসন কয়েকটি দেশের ওপর দফায় দফায় শুল্ক আরোপ করেছিল। রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনের ওপর হামলা চালালে বাইডেন প্রশাসন মস্কোর ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। ২০২৪ সালে কানাডা থেকে আমদানি করা কাঠের ওপর শুল্ক ৮ দশমিক ৫ থেকে বাড়িয়ে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ করেছিল বাইডেন প্রশাসন। তবে এটি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ধারাবাহিকতা। একই বছর চীন থেকে আমদানি করা কয়েকটি পণ্যের ওপরও শুল্ক বসিয়েছিল বাইডেন প্রশাসন। তখন দেশটির বৈদ্যুতিক গাড়িতে (ইভি) ১০০ শতাংশ, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামে ২৫ শতাংশ এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল।

৫. ট্রাম্পের দাবি, চাকরিচ্যুত ব্যক্তিরা বেসরকারি খাতে সহজে চাকরি পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছে। ট্রাম্পের দাবি, চাকরিচ্যুত এসব কর্মকর্তার অধিকাংশ বেসরকারি খাতে চাকরি পাচ্ছেন।

তবে তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। শুল্কের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাতগুলোয় নিয়োগ আশানুরূপ বৃদ্ধি পায়নি। তাছাড়া বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি সার্বিকভাবে সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।

সর্বশেষ চাকরির প্রতিবেদেন দেখা গেছে, মার্কিন অর্থনীতিতে ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৩৪ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা খাতে। এরপর ২৭ হাজার কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে খাদ্যসংশ্লিষ্ট পরিসেবা খাতে।

সার্বিকভাবে মার্কিন অর্থনীতিতে ২০২৫ সালে ৫ লাখ ৮৪ হাজার কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এর আগের বছর তথা বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছর দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল প্রায় ২০ লাখ।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি কারখানায় বিএমডব্লিউ গাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের গ্রিয়াওে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কারখানায় বিএমডব্লিউ গাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের গ্রিয়ারেফাইল ছবি: রয়টার্স

৬. ট্রাম্পের দাবি, কিছু অঙ্গরাজ্যে গ্যাসের দাম গ্যালনে ১ দশমিক ৯৯ ডলার। ট্রাম্পের এমন দাবি সঠিক নয়। গ্যাসের দামের পরিসংখ্যান রাখা আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে গ্যাসের গড় দাম গ্যালনে ২ দশমিক ৮২ ডলার। দেশটিতে গ্যাসের দাম সবচেয়ে কম ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যে গ্যালনে ২ দশমিক ৩১ ডলার।

৭. যুক্তরাষ্ট্রে এখন আগের তুলনায় বেশি গাড়িকারখানা তৈরি হচ্ছে। ট্রাম্প প্রায় এক বছর ধরে দাবি করে আসছেন যে যুক্তরাষ্ট্রে আগের তুলনায় বেশি গাড়ি তৈরির কারখানা গড়ে উঠছে। তবে গাড়ি শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের এ দাবি অতিরঞ্জিত। কারণ হুন্দাই, স্টেল্যান্টিসসহ কিছু কোম্পানি যেসব নতুন বিনিয়োগ করছে, তা দিয়ে নতুন কারখানা তৈরি নয়, বরং পুরনো কারখানা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের তথ্যমতে, পরিবহন সরঞ্জাম কারখানা তৈরিতে বেসরকারি খাতের ব্যয় (বিনিয়োগ) আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে কমেছে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড ইয়্যারোস আল-জাজিরাকে বলেন, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৪ সালের এপ্রিলে এ ব্যয় বেড়ে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু বর্তমানে তা কমে ১ হাজার ৪৪০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি