image

বিশ্লেষণ

সৌদির বিরল খনিজে বদলে যাবে মার্কিন-চীনের ভূরাজনীতি

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

খনিজ তেলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সৌদি আরবের বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির আধিপত্যে নতুন পালক যুক্ত হতে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিমা প্রভাবিত দেশটিতে প্রায় ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ ভাণ্ডার থাকার দাবি উঠেছে। যা বৈশ্বিক বিরল খনিজের দৌড়ে এক নতুন পরাশক্তি হিসেবে দেশটিকে হাজির করতে যাচ্ছে। সৌদির দাবি বাস্তবায়ন হলে দেশটির অর্থনীতিই শুধু অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে না, বরং পশ্চিমা মোড়ল ও প্রাচ্যের পরাশক্তি চীনের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, সোনা, তামা, দস্তা ও লিথিয়ামের পাশাপাশি দেশটির মাটির নিচে ডিসপ্রোজিয়াম, টারবিয়াম, নিওডিয়ামিয়াম ও প্রাসিওডিয়ামিয়ামের মতো বিরল মৃত্তিকা খনিজ রয়েছে। যা আধুনিক অস্ত্রব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইনের জন্য অপরিহার্য। আর বিরল খনিজ সরবরাহের মাধ্যমে এসব খাতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অর্থই হচ্ছে পরাশক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার ওপর ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমানে চীনের একচেটিয়া আধিপত্যে রয়েছে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী এসব খাত। যা সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণে গেলে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সমীকরণও পাল্টে যাবে। বিশেষত পশ্চিমা মোড়লের অতি ঘনিষ্ট সৌদি কর্তৃপক্ষ চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে বড় প্রভাবক হয়ে উঠবে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য বলছে, বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তোলিত ও ৯০ শতাংশ পরিশোধিত বিরল মৃত্তিকা খনিজ বর্তমানে চীনের একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। ঠিক এমন এক পথরেখাতে দাঁড়িয়েই সৌদি আরব নিজেকে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে নীরব ঘোষণা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের নিরবচ্ছিন্ন ও সস্তা জ্বালানি সরবরাহ। বিশেষত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দেশটি বৈশ্বিক খনিজ পরিশোধনের আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী ও সবচেয়ে মূল্যবান জ্বালানি কোম্পানি আরামকোর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ব্যবহার করে কম খরচে ও তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব।

শীর্ষস্থানীয় আমেরিকান আর্থিক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে খনিজ অনুসন্ধানে সৌদির বাজেট অবিশ্বাস্যভাবে ৫৯৫ শতাংশ বেড়েছে। দেশটি খনি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করে, করে ছাড় দিয়ে আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাসের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে টানতে চাইছে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত খনি কোম্পানি মাদেন ধাতু ও খনি খাতে ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণাও দিয়েছে। এসবই সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ইঙ্গিত।

সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। দেশটি তাদের খনি খাতকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে দেখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের শক্তিশালী অবকাঠামো ও জ্বালানি সক্ষমতা দেশটিকে আঞ্চলিক মিনারেল প্রসেসিং হাব বানাতে পারে। যে সম্ভাবনার দিকে তাকাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। চীন গত বছর সামরিক কাজে ব্যবহৃত ভারী বিরল মৃত্তিকা রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিকল্প কেন্দ্র খোঁজা জরুরি হয়ে পড়ে।

গেল বছরের নভেম্বরে ওয়াশিংটন সফরে সৌদি আরবের পক্ষে ঘোষণা দেওয়া হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এর অংশ হিসেবে খনিজ খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাও অন্তর্ভুক্ত। পেন্টাগনের সমর্থনপুষ্ট মার্কিন কোম্পানি এমপি মেটেরিয়ালস জানিয়েছে, তারা মাদেন ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে সৌদি আরবে একটি নতুন বিরল খনিজ শোধনাগার স্থাপন করবে। এতে ৪৯ শতাংশ মালিকানা থাকবে এমপি মেটেরিয়ালস ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের হাতে।

তবে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে সৌদি আরবের সামনে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্ক আর বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা সৌদির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্য এশিয়ার খনিজসমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে সৌদি আরব এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে। সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের খনিজ কৌশল ব্যবহার করে অর্থনীতির রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণে ভূমিকা রাখবে। তেলের যুগের মতোই, বিরল খনিজের যুগেও সৌদি আরব কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিতে পারলে মার্কিন-চীনের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের বদল ঘটবে। যা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

» ইন্দোনেশিয়ায় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার

সম্প্রতি