আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলকে ব্যবহার করে বিদেশে অবস্থানরত সমালোচক ও রাজনৈতিক বিরোধীদের নিশানা করছে রাশিয়া। এমন অভিযোগ উঠে এসেছে প্রথমবারের মতো ইন্টারপোলের এক তথ্য ফাঁসকারীর (হুইসেলব্লোয়ার) প্রকাশ করা হাজার হাজার নথিতে। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস এবং ফরাসি তদন্তকারী সংস্থা ‘ডিসক্লোজ’-এর হাতে আসা ইন্টারপোলের এই হাজার হাজার ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, ইন্টারপোলের ‘ওয়ান্টেড লিস্ট’ ব্যবহার করে রাশিয়া অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ তুলে বিদেশে থাকা রাজনৈতিক বিরোধী, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকের মতো মানুষদেরকে গ্রেপ্তার করার অনুরোধ জানায়।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক দশকে ইন্টারপোলের স্বাধীন অভিযোগ ইউনিটে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় সবথেকে বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এই সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা তুরস্কের তুলনায় তিন গুণ বেশি।
তাছাড়া, রাশিয়ার গ্রেপ্তারি অনুরোধের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মামলা বাতিল হয়েছে, অন্য যে কোনও দেশের তুলনায়। ইন্টারপোল কোনও বৈশ্বিক পুলিশ বাহিনী নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে সহায়তা করে।
রেড নোটিশ হল ইন্টারপোলের ১৯৬টি সদস্য দেশের কাছে পাঠানো একটি সতর্কবার্তা, যাতে কোনও ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানানো হয়। রেড ডিফিউশন একই ধরনের অনুরোধ হলেও তা কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে পাঠানো হয়।
ফাঁস হওয়া নথি বলছে, রাশিয়া এই নোটিশগুলোকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ব্যবসায়ী এবং সাংবাদিকদের অপরাধী সাজিয়ে গ্রেপ্তারের আবেদন করছে। ফাঁস হওয়া নথিতে নাম থাকা রুশ ব্যবসায়ী ইগর পেস্ত্রিকভ বলেন, ২০২২ সালের জুনে তিনি রাশিয়া ছাড়ার পর জানতে পারেন, তার বিরুদ্ধে একটি রেড ডিফিউশন জারি হয়েছে।
তিনি ইউক্রেইনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর চার মাস পর ফ্রান্সে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। তার তখন মনে হয়েছিল দুটো বিকল্প পথ আছে। “এক- পুলিশের কাছে গিয়ে বলা যে, আমি ইন্টারপোল সিস্টেমে আছি এবং গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নেওয়া কিংবা আত্মগোপনে থাকা। তার কথায়, এই অবস্থায় থাকা মানে জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। “আপনি বাড়ি ভাড়া নিতে পারেন না, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে যায় এবং সব সময় গ্রেপ্তারের আতঙ্কে থাকতে হয়।”
প্রায় দুই বছর ওয়ান্টেড তালিকায় থাকার পর ইন্টারপোলের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা সিসিএফ রায় দেয় যে, পেস্ত্রিকভের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক। এরপর ইন্টারপোল তাকে আটকের অনুরোধ বাতিল করে। ইন্টারপোলের সংবিধানে স্পষ্টই বলা আছে, সংস্থাটি রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা জাতিগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। ইন্টারপোল ২০১৮ সালের পর থেকে কোন দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, সে তথ্য প্রকাশ না করায় সমস্যার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ফাঁস হওয়া নথিতে প্রথমবারের মতো বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেইনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযানের পর ইন্টারপোল রাশিয়ার কর্মকা-ের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি শুরু করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, ইউক্রেইন যুদ্ধের ভেতরে বা বাইরের ব্যক্তিদের নিশানা করতে ইন্টারপোলের চ্যানেলের অপব্যবহার ঠেকানো। কিন্তু ফাঁস হওয়া নথি এবং হুইসেলব্লোয়ারের দাবি অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা রাশিয়াকে থামাতে পারেনি। এমনকি ২০২৫ সালে অনেক কঠোর বিধিনিষেধ নিঃশব্দে তুলে নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
নথিতে দেখা গেছে, গত ১১ বছর ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে। গত দশকে রাশিয়ার করা আবেদনের প্রেক্ষিতে অন্তত ৭০০ জন ব্যক্তি ইন্টারপোলে অভিযোগ জানিয়েছেন, যার মধ্যে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের নোটিশ বাতিল করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, রাশিয়ার বেশিরভাগ আবেদনই ছিল ত্রুটিপূর্ণ বা নিয়মবহির্ভূত।
ব্রিটিশ ব্যারিস্টার বেন কিথ বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া রেড নোটিস অপব্যবহারের অন্যতম প্রধান দেশ।’ রাশিয়ার ইন্টারপোলের অপব্যবহার ঠেকানোর উদ্যোগ সফল হয়নি বলেও জানান তিনি।
শুধুমাত্র রেড নোটিশ নয়, ইন্টারপোলের মেসেজিং সিস্টেম ব্যবহার করেও রাশিয়া বিভিন্ন দেশে থাকা সমালোচকদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
হুইসেলব্লোয়ার ইন্টারপোলের ম্যাসেজিং সিস্টেমে পাঠানো হাজার হাজার বার্তা বিবিসি-কে দিয়েছেন। এতে দেখা যায়, রেড নোটিস বাতিল হলেও রাশিয়া অনানুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি আইন প্রয়োগকারী এজেন্টদের কাছে ব্যক্তিদের অবস্থান জানতে চেয়েছে।
ফাঁস হওয়া নথিতে উঠে এসেছে সাংবাদিক আরমেন আরমানিয়ানের কথা। ২০২১ সালে ছাত্রবিক্ষোভ নিয়ে প্রতিবেদন করা এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনিকে সমর্থন দেওয়ার কারণে আরমানিয়ানকে রাশিয়া থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।
আরমানিয়ান প্রথমে আর্মেনিয়ায় যান এবং পরে জারমানিতে যান। রাশিয়া তার অবস্থান জানতে দুই দেশেই আনুষ্ঠানিক রেড নোটিশ ব্যবস্থা এড়িয়ে গিয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে বার্তা পাঠিয়েছিল ‘প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে।”
ইন্টারপোলের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অভ্যন্তরীন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খোদ সংস্থাটির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই রাশিয়ার কর্মকা- নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক প্রতিবেদনে রাশিয়ার ইন্টারপোল ব্যবস্থার ‘ইচ্ছাকৃত অপব্যবহার’ এবং সংস্থাটির নিয়ম ‘স্পষ্টতই লঙ্ঘনের’ কথা উল্লেখ করা হয়।
এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) যখন পুতিনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে, তখন রাশিয়া আদালতের বিচারক ও কৌঁসুলিদের বিরুদ্ধে রেড ডিফিউশন দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
আইনজীবীরা বলছেন, ইন্টারপোলের উচিত তাদের সিস্টেমের অপব্যবহার ঠেকাতে আরও বেশিকিছু করা। ধারাবাহিক ও গুরুতর অপব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে সাময়িকভাবে ইন্টারপোল ব্যবস্থা থেকে স্থগিত করা উচিত।
অন্যথায় ইগর পেস্ত্রিকভের আশঙ্কাই সত্য হবে। তার কথায়, “একটি বোতাম চেপেই রাশিয়া যে কোনও কিছুতে ঢুকে কারও ওপর যে কোনও অপরাধ চাপিয়ে দিয়ে বিশ্বজুড়ে কাউকে নিপীড়ন করতে পারবে।”