যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। গত ৮ বছরের মধ্যে কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এটিই প্রথম চীন সফর। মূলত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যেই স্টারমারের এ উদ্যোগ। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার, (২৭ জানুয়ারী ২০২৬) কিয়ার স্টারমারের চীন যাওয়ার কথা। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
তিন দিনের এই সফরে স্টারমারের সঙ্গে থাকছেন সরকারের দুই মন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল। বেইজিংয়ে চীনা শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি সাংহাই যাবেন এবং সেখান থেকে সংক্ষিপ্ত সফরে জাপানে যাবেন।
স্টারমারের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কারণে দীর্ঘদিনের মিত্র ওয়াশিংটনের সঙ্গে লন্ডনের টানাপোড়েন চলছে। কিংস কলেজ লন্ডনের চীনা স্টাডিজের অধ্যাপক কেরি ব্রাউন মনে করেন, বর্তমানে লন্ডন ও ওয়াশিংটনের চেয়ে লন্ডন ও বেইজিং অনেক বৈশ্বিক ইস্যুতে একে অন্যের বেশি কাছাকাছি।
২০২৪ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই স্টারমার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থিদের ওপর দমন-পীড়ন এবং গোয়েন্দাগিরি ও সাইবার হামলার অভিযোগে বিগত বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছিল। স্টারমার এখন সেই অচলাবস্থা কাটাতে চান।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এ মাসেই চীনের সঙ্গে একটি বড় অর্থনৈতিক চুক্তি করেছেন। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে, কানাডা যদি এই চুক্তি এগিয়ে নেয় তবে সে দেশের পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ ট্যারিফ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে চীন এখন অন্যান্য মার্কিন মিত্রদের কাছে টানার সুযোগ পাচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস গতকাল সোমবার জানিয়েছে, বেইজিং দেশগুলোর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে কারণ তারা একটি ‘বহুমেরু বিশ্বে’ বিশ্বাসী।
ব্রিটেন তার জনসেবা ও অর্থনীতির মানোন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক চায়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১২ মাসের তথ্যে দেখা গেছে, চীন ব্রিটেনের চতুর্থ বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, যার মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড। তবে এই কৌশল নিয়ে নিজ দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন স্টারমার।
চায়না স্ট্র্যাটেজিক রিস্ক ইনস্টিটিউটের নীতি পরিচালক স্যাম গুডম্যান অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে ব্রিটেন এখন পর্যন্ত খুব সামান্যই অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগে চীনের অংশ মাত্র ০.২ শতাংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
স্টারমারের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন তার সরকার লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে চীনের একটি বিশাল দূতাবাস নির্মাণের বিতর্কিত পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। সমালোচকদের মতে, এই ভবনের ফলে চীনের জন্য ব্রিটেনে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো সহজ হবে।
গত মাসে স্টারমার বলেছিলেন, চীন ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হলেও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখা জাতীয় স্বার্থেই প্রয়োজন। একইসঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ডনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবি পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক সংবেদনশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।