image

বিশ্লেষণ

ঘন ঘন ভূমিকম্প কি বড় বিপদের বার্তা

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ভোরে ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে সাতক্ষীরায়। প্রায় ২১ ঘণ্টার পর দুই দফা ভূমিকম্পে কাঁপল বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা। ঠিক একইভাবে গেল বছরের ২২ নভেম্বর দেশে সাড়ে সাত ঘণ্টায় তিনবার ভূমিকম্প হয়েছে। সকালে একবার ও সন্ধ্যায় পরপর দুবার। প্রথমটির উৎপত্তিস্থল রাজধানীর বাড্ডা, দ্বিতীয় ও শেষটির উৎপত্তি নরসিংদীতে। এর আগেও অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার কেঁপেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এগুলো কি বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস? নাকি স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে তাত্ত্বিক বিষয় ব্যাখ্যা করা দরকার। তাতে বোঝা যাবে বাংলাদেশ কেন বারবার ভূমিকম্প অনুভব করছে। কেনই বা একই স্থান অল্প সময়ের ব্যবধানে কেঁপে কেঁপে উঠছে।

প্রথমত, বাংলাদেশ সরাসরি কোনো বড় টেকটোনিক প্লেটের ওপর না থাকলেও তিনটি সক্রিয় প্লেটের সংযোগ অঞ্চলের খুব কাছে রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট ও মিয়ানমার (বার্মা) মাইক্রোপ্লেট। এগুলোর মধ্যে চলমান সংঘর্ষ ও সরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় ভূগর্ভে চাপ জমতে থাকে। সেই চাপ সময়ের ব্যবধানে ছোট বা মাঝারি ভূমিকম্পের মাধ্যমে মুক্ত হয়।

বিশেষ করে বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা সাগাইং ফল্ট দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সক্রিয় ফল্ট। যেখানে সৃষ্ট কম্পনের প্রভাব বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অনুভূত হয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, একটির পর আরেকটি কম্পন হচ্ছে। এর পেছনে কারণ কী? এক্ষেত্রে ভূমিকম্পকে একক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না। একটি ভূমিকম্পের পর ভূগর্ভে জমে থাকা চাপ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। বরং সেই চাপ পাশের ফল্ট বা দুর্বল অঞ্চলে সরে যায়। যাকে ভূতত্ত্বে বলা হয় স্ট্রেস ট্রান্সফার।

মূলত, স্ট্রেস ট্রান্সফারের কারণেই খুব কম সময়ের ব্যবধানে কাছাকাছি এলাকায় বার বার ভূকম্পন অনুভূত হতে পারে। এমনকি, একদিনে একাধিকবার ভূকম্পন হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তবে এক্ষেত্রে অনেকের মধ্যেই কৌতুহল জাগে, এসব ছোট ছোট আর ঘন ঘন ভূমিকম্প কি বড় কোনো বিপদের ঝুঁকির বার্তা দেয়?জনমনে প্রচলিত একটি ধারণা রয়ে গেছে। তা হলো ছোট ভূমিকম্প মানেই বড় বিপর্যয়ের পূর্বসংকেত।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বাস্তবিক পক্ষে ঘটনা একদম সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে ছোট ভূমিকম্প জমে থাকা শক্তির একটি অংশ মুক্ত করে দেয়, যা বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কিছুটা কমাতেও পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি চাপের ইঙ্গিতও হতে পারে। বিজ্ঞান এখনো নির্ভুলভাবে বলতে পারে না, কোন ছোট ভূমিকম্প বড়টির পূর্বাভাস আর কোনটি নয়।

আরেকটি প্রশ্ন প্রায়ই উদয় হয়। দেশের কোনো জায়গায় ভূমিকম্পন হলে তা দূর থেকে কীভাবে অনুভূত হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাটা হচ্ছে, বাংলাদেশের বড় অংশই গাঙ্গেয় বদ্বীপের নরম পলিমাটির ওপর অবস্থিত। এই মাটি ভূকম্পনের তরঙ্গকে অনেক সময় বাড়িয়ে তোলে। ফলে কেন্দ্র অনেক দূরে হলেও কম্পন তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হয়। এ কারণেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি দূরত্বের ভূমিকম্পও স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যায়।

চূড়ান্ত কথা হচ্ছে, ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে রয়েছে। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পের নিশ্চিত বার্তা দিচ্ছে না। প্রকৃত বিপদের বড় কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ভবন আর ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণবিধি না মানা। অর্থাৎ, ভূমিকম্প নিজে যতটা না ভয়ংকর, তার চেয়ে বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে অপ্রস্তুত অবকাঠামো।

তাই, ঘন ঘন ভূমিকম্প মানেই কিন্তু আসন্ন মহাবিপর্যয় নয়। বিষয়টা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিকও নয়। যদিও এগুলো উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। এসব কম্পন মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের অংশ। এখনই আতঙ্ক নয়, বরং দরকার ভূমিকম্প-নিরাপদ নির্মাণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা। কারণ বড় বিপর্যয় এলে সেটি ঠেকানো না গেলেও ক্ষতি কমানো সম্ভব।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি