image

গণছাঁটাই ও পদত্যাগ

নীতি পাল্টানোয় লোকসানে ডুবছে ওয়াশিংটন পোস্ট

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট এখন এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই, পাঠক ক্ষোভ, আর্থিক লোকসান, সবশেষে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রকাশক উইল লুইসের পদত্যাগ এই সংকটকে আরও প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। তবে এই সংকট কেবল ব্যবসায়িক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অবস্থান ও মালিকানার হস্তক্ষেপ। যা মার্কিন গণমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

গেল সপ্তাহে ওয়াশিংটন পোস্টে ঘোষিত বড় ধরনের গণছাঁটাইয়ে কয়েকশ’ সাংবাদিক চাকরি হারান। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০০ সাংবাদিকের মধ্যে ৩০০ জনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয়, ক্রীড়া ও বৈদেশিক শাখার বড় অংশই বাদ পড়েছে। এমনকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জনপ্রিয় পডকাস্ট পোস্ট রিপোর্টস। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওয়াশিংটনে পত্রিকাটির সদর দপ্তরের সামনে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেন। পাঠকদের একাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবস্ক্রিপশন বাতিলের ঘোষণা দেন। কর্মীদের মনোবল ও পাঠকদের আস্থায় এই ছাঁটাই বড় ধরনের আঘাত হানে।

ওয়াশিংটন পোস্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, বিজ্ঞাপন ও গ্রাহকসংখ্যা কমে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতেই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ সংবাদপত্র বর্তমানে ব্যবসায়িক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই বাস্তবতায় নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নিজেদের ডিজিটাল কৌশল জোরদার করে লাভজনক অবস্থানে ফিরতে পারলেও ওয়াশিংটন পোস্ট তাতে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, ধনকুবের জেফ বেজোসের মালিকানাধীন হয়েও ওয়াশিংটন পোস্ট কেন ব্যর্থ হলো? সমালোচকদের মতে, সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে সম্পাদকীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলের চেষ্টা। বলা ভালো, ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের আগে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী কমলা হ্যারিসের প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্পাদকীয় সমর্থন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন পোস্ট। যা ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানোর ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, সেই সিদ্ধান্তে মালিক জেফ বেজোস ও সিইও উইল লুইস সরাসরি প্রভাব খাটান।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, জেফ বেজোস ও সিইও উইল লুইসের সেই সিদ্ধান্তের পর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডিজিটাল গ্রাহক সাবস্ক্রিপশন বাতিল করেন। শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, এই সিদ্ধান্তকে অনেক পাঠক ও সাংবাদিক দেখেছেন সম্পাদকীয় স্বাধীনতার রক্ষাকবচ ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলা হিসেবে। এমনকি এই সিদ্ধান্তকে তৎকালীন রিপাবলিকান প্রার্থী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নতিস্বীকার বলেও ব্যাখ্যা করা হয়।

লোকসানের চাপের মধ্যেই উইল লুইস পদত্যাগ করেছেন। সহকর্মীদের পাঠানো ই–মেইলে তিনি বলেছেন, ‘আমার জন্য সরে দাঁড়ানোর এটাই উপযুক্ত সময়।’ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক টাম্বলার সিইও ও ওয়াশিংটন পোস্টের চিফ ফিন্যান্সিয়াল কর্মকর্তা জেফ ডি’ওনোফ্রিও।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, নতুন নেতৃত্ব কি কেবল খরচ কমানোর পথে হাঁটবে, নাকি সম্পাদকীয় বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারে জোর দেবে? যেখানে পাঠকের আস্থার সংকট জোরালো হয়েছে সেখানে কর্মী ছাঁটাই সমস্যার সমাধান নয়। বরং পাঠকেব বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনাই হবে প্রধান কাজ।

২০২৪ সালে প্রায় ১০ কোটি ডলার লোকসান ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের বিদায়,এই ক্ষতি সংখ্যায় মাপা যায়। কিন্তু সাবেক নির্বাহী সম্পাদক মার্টি ব্যারনের ভাষায়, এই গণছাঁটাই ছিল ‘বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার দিন’।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন পোস্টের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়; বরং পাঠকের আস্থা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন। ডিজিটাল যুগে যেখানে পাঠকরা কনটেন্টের পাশাপাশি নীতিগত অবস্থানও বিবেচনা করেন, সেখানে রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলের চেষ্টা উল্টো ফল দিয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের এই সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু অর্থ বা প্রযুক্তি নয়, একটি সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বাধীনতা। উদারপন্থা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, পাঠক বিচ্ছিন্নতা আর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ মিলিয়ে যে ক্ষতির মুখে পত্রিকাটি পড়েছে, তা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে না। সিইওর পদত্যাগ হয়তো একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু আসল প্রশ্ন রয়ে গেছে, ওয়াশিংটন পোস্ট কি তার ঐতিহাসিক মূল্যবোধে ফিরে যেতে পারবে?

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি